সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না

অনলাইন ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালি বীরের জাতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। বঙ্গবন্ধুর কথাই সত্য। কেউ বাঙালি জাতিকে দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

গতকাল শনিবার করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) গত শুক্রবার বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে। এর অর্থ, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হবে। দেশের এই অর্জন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তিনি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণের কৃতিত্ব জনগণকে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হন। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। তিনিই বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুখবরটি প্রধানমন্ত্রীকে প্রথম অবহিত করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হন। সেখানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রায় এক বছর পর সংবাদ সম্মেলনে এসে পুরোটা সময় বেশ হাসিখুশি ছিলেন। তার মুখে ছিল লাল-সবুজ রঙের মাস্ক। সংবাদ সম্মেলনে গণভবন প্রান্ত থেকে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। পরে প্রধানমন্ত্রীর হাতে জাতিসংঘের সুপারিশপত্র হস্তান্তর করেন অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় প্রান্তের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেশ খোলামেলা কথা বলেছেন; সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বাংলাদেশ নিয়ে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন আলজাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও করোনাভাইরাসের টিকা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন।

তিনি জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকার করতে দল-মত নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শূন্য হাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে মাত্র সাড়ে তিন বছরে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যান। তারই হাতে গড়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আজ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হলো বাংলাদেশ। তিনি এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে উৎসর্গ করে বলেন, জনগণের সম্মিলিত চেষ্টায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। জাতির জন্য এটা অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের। এই উত্তরণ এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করে। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশ উল্টোপথে যাত্রা করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর আবার উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছয় বছর নির্বাসিত ছিলাম। সামরিক শাসকরা দেশ চালিয়েছে। জিয়াউর রহমান আমাকে দেশে আসতে দিতে চায়নি। শেখ রেহানাকে পাসপোর্ট দেয়নি। তবে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের সমর্থনে দেশে ফিরে আসি। তারপর প্রত্যন্ত এলাকা সফর করি। প্রতিজ্ঞা করি, যদি কোনো দিন আল্লাহ দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, তাহলে গ্রামোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব। তখন ৭০-৮০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করত। আমার মনে হয়েছিল, গ্রামের মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারলে বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে। ১৯৯৬ সালে জনগণের রায় নিয়ে প্রথমবার সরকার গঠন করে আমার এই চিন্তা-চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ফলে ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও লুটপাট বেড়ে যায়। পাঁচবার দুর্নীতিতে শীর্ষ অবস্থানে ছিল দেশ। এরপর গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগ নিরলস পরিশ্রম করেছে। আজকের অর্জন তারই ফসল। দেশের মানুষই সব করেছে। সরকার নীতি-সহায়তা দিয়েছে। মুজিববর্ষে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য, দেশের একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এক যুগ আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। বদলে যাওয়া এই দেশকে বুঝতে আর্থিক এবং অন্য সূচকগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ১০৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২০ সালে তা ৩৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮-০৯ বছরে রপ্তানি আয় ছিল ১৫ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ বছরে তা ৪০ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ বছরের ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২০ দশমিক ৫ ভাগ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। ২০০৯-১০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ২৭১ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৪ হাজার ৪২১ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৪৭ থেকে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত হওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব’: প্রধানমন্ত্রী এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা দেওয়াও সরকারের দায়িত্ব। সে জন্যই এ আইন করা হয়েছে, যাতে শিশু ও যুবকরা বিপথে যেতে না পারে। তারা যেন কোনো অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত না হয়। তারা যেন জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত হতে না পারে। কেউ এমন কোনো কাজ যেন না করে যেটা দেশের জন্য ক্ষতি ও হুমকি। সে জন্যই ডিজিটাল নিরাপত্তা দেওয়া একান্ত অপরিহার্য।

এ আইনের সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, সমালোচনা যারা করেছে, তারা করবেই। তবে কারও মৃত্যু তার কাম্য নয়। আর কেউ অসুস্থ হয়ে মারা গেলে কী করার আছে? কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ সৃষ্টি করাও কাম্য নয়।

তিনি এ প্রসঙ্গে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার কথা তুলে ধরে বলেন, সে রকম ঘটনা তো আর ঘটেনি। যারা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, তাদের সঙ্গেও তো অনেকে গাঁটছড়া বেঁধেছিল। তিনি আরও বলেন, আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা, তা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। কোনটা আপনার কাছে অপপ্রয়োগ, কোনটা অপপ্রয়োগ না, এটা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আইন তার নিজ গতিতে চলছে ও চলবে।

‘চিন্তার কিছু নেই’: আলজাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এ ক্ষেত্রে তার কিছু বলার নেই। কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। একটা চ্যানেলে কী বলছে না বলছে, সেটা দেশের মানুষ বিচার করবে। কতটুকু মিথ্যা, কতটা বানোয়াট, তারা বিচার করবে। ওই প্রতিবেদন নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তবে ওই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে অতীতে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোলাচালান মামলা- এমনকি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিবার যুক্ত থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর টিকা গ্রহণ: শেখ হাসিনা বলেন, তিনিও টিকা নেবেন। তবে দেশের মানুষের একটা অংশকে টিকা দেওয়ার পর তিনি নেবেন। তিনি আরও বলেন, কতজনকে টিকা দিতে পারলাম, সেটাই বড় বিষয়। আমি নিজে একটা টিকা না নিয়ে অন্য একজন নিলে, যদি তার জীবন বাঁচে সেটাই বড়। সরকারের পরিকল্পনায় জনগণের একটা অংশকে টিকা দেওয়ার বিষয়টি ঠিক করা আছে। সেই পরিমাণ লোককে টিকা দিয়েই তারপর আমি টিকা নেব। কাউকে বাদ রেখে আগে নেব না।

আরও তিন কোটি ডোজ টিকা আসছে: প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষককে টিকা নিতে হবে। যারা হোস্টেলে থাকবে, তাদের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী যাদের টিকা নেওয়ার কথা, তাদেরও টিকা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, আরও তিন কোটি ডোজ টিকা আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য দেশ থেকে টিকা আমদানি সম্ভব না হলে দেশেই যাতে তৈরি করা যায়, সে বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে: ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এত আগে থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে কী হবে? সময় এলে দেখা যাবে। এখন এলডিসি থেকে উত্তরণ হচ্ছে, তার প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। তিনি ছোট বোন শেখ রেহানার পরামর্শে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন জানিয়ে বলেন, রেহানা বলেছিল ১৬ কোটি মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে ১০ লাখ লোকের করতে পারবা না? তার কথায় শক্তি পেয়ে রোহিঙ্গাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি।

Pin It

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *