বিজ্ঞানী সেজে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা

অনলাইন ডেস্ক

করোনার কয়েল ওষুধ ফর্মুলা, সমুদ্রের পাড় উঁচু, জ্বালানিবিহীন জেনারেটর তৈরিসহ বিভিন্ন প্রলোভনে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বিজ্ঞানী পরিচয় দেয়া সাইফুল ইসলাম ওরফে সায়েন্টিস্ট সাইফুল। দশ বছরের বেশি সময় ধরে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান ছাড়াও বিভিন্ন দেশের প্রধানের কাছ থেকে জলবায়ু প্রজেক্ট বাংলাদেশে আসবে বলে ভুক্তভোগীদের বলতেন।

মঙ্গল ও বুধবার দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে ‘রাজা-বাদশা’ গ্রুপের ভুয়া বিজ্ঞানী সাইফুল, তার স্ত্রী, দুই ছেলেসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানতে পারে র‌্যাব।

বুধবার বিকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টার সংবাদ সম্মেলনে এলিট ফোর্সটির মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, দশ বছরের বেশি সময় ধরে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে প্রাধান্য পায় এমন বিষয় নিয়ে প্রতারণা করেন সাইফুল। জলবায়ুসংক্রান্ত বিশ্বব্যাপী যে টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, সেটা দেখিয়ে কম শিক্ষিত বা যাদের জমিজমা আছে তাদের বুঝিয়েছেন সাইফুল বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা থেকে দেশে টাকা আনবেন। বিশ্বের অনেক দেশ তাকে এসব টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। এই বিনিয়গের বরাদ্দ পেতে কিছু টাকা-পয়সা তাকে খরচ করতে হচ্ছে। এই পরিপেক্ষিতে সাধারণ মানুষকে বোঝাতেন- যারা যারা টাকা দেবে পরবর্তী সময়ে তারা প্রচুর মুনাফা পাবে।’

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- চক্রের মূলহোতা মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে বিজ্ঞানী সাইফুল ওরফে সায়েন্টিস্ট সাইফুল, তার স্ত্রী মোছা. বকুলি ইয়াসমিন, মো. ইমরান রাজা, মোছা. কাকুলী আক্তার, মো. রোমান বাদশা, মো. আনিসুজ্জামান সিদ্দীকী, মো. নাজমুল হক, মো. তারেক আজিজ, মো. বেল্লাল হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. শিমুল মিয়া, মো. নুরনবী, মো. আবুল হাশেম, মো. আলী হোসেন, মো. শওকত আলী ও মো. রোকনুজ্জামান।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন, পরিবেশ বান্ধব যানবাহন, ডায়াবেটিক নিরাময় প্রতিষেধক, হৃদরোগ নিরাময় প্রতিষেধক প্রজেক্ট দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছেন সাইফুল। তার মাধ্যমে প্রতারিত হওয়া কিছু ভিকটিম আমাদের জনিয়েছে, ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের কোটি কোটি টাকা লাভ দিতে চেয়েছিলেন সাইফুল। গ্রেপ্তার রেজাউল ভুক্তভোগীদের বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে পানি বেড়ে যাচ্ছে। সেখানে (সমুদ্রে) বিভিন্ন ডুবোচর আছে। সেখানে মাটি খনন করে সমুদ্রের পাড় ৩০ ফিট উঁচু করবেন, যা সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেখানে তিনি গাছরোপণ করবেন।

করোনার কয়েল ওষুধ ফর্মুলা আবিষ্কার

বর্তমান করোনাকালে একটি কয়েল ফর্মুলা দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন কথিত বিজ্ঞানী সাইফুল। তিনি ভুক্তভোগীদের বলেছেন, মশার জন্য যে কয়েল ব্যবহার করা হয় তাতে আয়োডিন জাতীয় কেমিকেল ব্যবহার করবেন। এই আয়োডিন যেহেতু গলগণ্ডসহ বিভিন্ন রোগে উপকারী তাই কয়েলটি ঘরে জ্বালালে ধোঁয়ার মাধ্যমে মুখে গেলে করোনা মারা যাবে। কারণ, মুখের মধ্যদিয়ে করোনা মানুষের শরীরে ঢুকে। এই কয়েলের ধোঁয়াতে গলায় করোনা মারা যাবে।

এই পদ্ধতি তিনি সম্প্রতি সাধারণ মানুষকে বলা শুরু করেন। সরকার তার এই প্রজেক্ট গ্রহণ করেছে বলেও দাবি করেন।

যত অভিযোগ সাইফুলের বিরুদ্ধে

র‌্যাবের মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এখন পর্যন্ত ১৮ জন ভুক্তভোগীকে আমরা পেয়েছি, যারা সরাসরি আমাদের কাছে অভিযোগ করেছে। আর টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এলাকাতে শতাধিক ভিকটিম রয়েছে, যারা তার মাধ্যম প্রতারিত হয়েছে। যারা সরাসরি অভিযোগ দিয়েছে, তাদের প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন কথিত এই বিজ্ঞানী। এছাড়া আগে থেকে তার বিরুদ্ধে পাঁচটি প্রতারণার মামলা ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তার যাতায়াত ছিল। টাঙ্গাইল ছাড়াও উত্তরাতে একটি অফিস আছে। সেখানে তার স্ত্রী, দুই ছেলে, পুত্রবধূসহ ১৫ জন কাজ করতেন। এছাড়া এজেন্ট হিসেবেও তার সঙ্গে অনেকে কাজ করত।

ছয়জন বডিগার্ড

বিজ্ঞানী পরিচয়ধারী সাইফুল ছয়জন বডিগার্ড নিয়ে চলাফেরা করতেন। যারা সব সময় সশস্ত্র অবস্থায় থাকতেন। এরমধ্যে একটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া জব্দ করা সরকারি সিল, চিঠি সব বানোয়াট। প্রতারণার মাধ্যমে তিনি ৩৬০ একর জমি বরাদ্দ নিয়েছেন। এই জমিতে বিদেশিরা প্রজেক্ট করবে বলে প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। যেসব ব্যাংকের চেক বই জব্দ করা হয়েছে, সেখানে কীভাবে লেনদেন হয়েছে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আর মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়ে সিআইডিকে খতিয়ে দেখতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হবে।

কে এই কথিত বিজ্ঞানী সাইফুল

এলিট ফোর্সের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি পাস। তিনি প্রথমে টিউশনি ও পরবর্তী সময়ে পোল্ট্রি ফিড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রায় ১১ বছর ধরে বিভিন্ন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিকটিমদের প্রলুব্ধ করতেন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ভুয়া বিজ্ঞানী সাইফুলের সঙ্গে বিদেশি বিজ্ঞানী, গবেষক ও নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করতেন। যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে রাজি রয়েছেন বলেও মিথ্যা তথ্য দিতেন। ভিকটিমদের বিশ্বাসযোগ্যাতা অর্জন করতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, তুরস্ক প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ের এরদোয়ান ছাড়াও সৌদি আরবের তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাইপ্রাস ও জাপানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করতেন। এছাড়াও ইরাকের এক আইনজীবী তার উদ্ভাবিত প্রজেক্টে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন বলে দাবি করতেন। এভাবে তিনি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারণা চালিয়ে গেছেন বছরের পর বছর।

এই রকম আরো কিছু খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button