লকডাউনের স্ট্যান্ডে-ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ভিড়

ভোরের বাংলাদেশ প্রতিবেদক ঃ
আগামীকাল বুধবার থেকে সারাদেশে শুরু হচ্ছে এক সপ্তাহের লকডাউন। গত ৫ এপ্রিল থেকে বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার বাস। কাল থেকে শুরু হওয়া এক সপ্তাহের লকডাউনকালেও বন্ধ থাকবে। অনেকেই মনে করছেন এক সপ্তাহের লকডাউন দুই সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে কর্মহীন মানুষ এবং যারা ঢাকায় এসে আটকা পড়েছিলেন, তারা গ্রামের বাড়ি ফিরতে মরিয়া। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবারও মানুষ বিকল্প বাহনে বাড়ি ফিরছেন। পথে পথে দুর্ভোগ মাড়িয়ে মানুষকে ছুটতে দেখা গেছে।

‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ ঘোষণায় গতকাল শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে উভয়মুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। লঞ্চ বন্ধ থাকলেও ফেরি, স্পিডবোট, ট্রলারে হাজার হাজার যাত্রী গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে পারাপার হচ্ছেন। ফেরিতে যাত্রীদের চাপ সামলাতে কম যানবাহন নিয়েই ফেরি পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে বাড়তি ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরছে যাত্রীরা। কোথাও দেখা যায়নি স্বাস্থ্যবিধি মানার লক্ষণ।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে শত শত মানুষ বিকল্প যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা

করে চট্টগ্রামের উদ্দেশে কয়েকটি দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। এসব যাত্রীকে আবার অত্যন্ত গোপনে বাস টার্মিনালের পেছন দিক থেকে বাসে তোলা হচ্ছে। গাবতলী বাস টার্মিনালেও বাড়িফেরা মানুষের প্রচ- ভিড় ছিল। অসংখ্য মানুষকে এই টার্মিনালে বিকল্প যানের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মহামারী করোনার সংক্রমণ এড়াতে ১৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউনের কথা শোনার পর থেকেই পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ছোট গাড়ি প্রাইভেটকার ও সাধারণ পণ্যবোঝাই ট্রাকের চাপ বেড়ে গেছে। গতকাল সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত পাটুরিয়া ঘাট পয়েন্টে পারের অপেক্ষায় ছিল বিভিন্ন ধরনের ছয় শতাধিক যানবাহন।

বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাট পয়েন্টের বাণিজ্য বিভাগের সহকারী ম্যানেজার মহিউদ্দিন রাসেল জানান, পাটুরিয়ায় দুটি ট্রাক টার্মিনালে তিন শতাধিক পণ্যবোঝাই ট্রাক ও তিন শতাধিক ছোট গাড়ি (প্রাইভেটকার) পারের অপেক্ষায় রয়েছে।

তিনি আরও জানান, লকডাউনের কারণে অনেকে গ্রামের বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। গতকাল সকাল থেকেই ছোট গাড়ি প্রাইভেটকার আসতে শুরু করে। বর্তমানে ১৬টি ফেরির মধ্যে ১৫টি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। বাকি একটি ফেরি ভাসমান কারখানা মধুমতিতে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে।

পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় দায়িত্বরত সার্জেন্ট রফিক জানান, এই ঘাটে ছোট গাড়ির বেশ চাপ রয়েছে। যে কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ছোট যানবাহনগুলোকে পার করা হচ্ছে। চাপ কমে এলে সাধারণ পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোকে পার করা হবে।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়াঘাটে গতকাল সোমবার দিনভর ঘরমুখো যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। ফেরি ও ট্রলারযোগে গাদাগাদি করে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন এসব যাত্রী। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এই ঘাটে সহস্রাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। এ অবস্থায় ফেরি ও যাত্রী পারাপারে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

রাজধানী থেকে পিকআপ ভ্যান ও কাভার্ডভ্যানে চড়ে শিমুলিয়াঘাটে ছুটে আসছেন ঘরমুখো মানুষ। অনেকে রাজধানীর বাসাবাড়ির মালামাল সঙ্গে করে ছুটে আসছেন ঘাটে।

বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়াঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ ফয়সাল জানিয়েছেন, গতকাল দক্ষিণবঙ্গের এ নৌরুটে যাত্রী ও যানবাহন পারাপারে ১৪টি ফেরি চলাচল করে। যাত্রী ও যানবাহন পারাপারে উভয়মুখেই চাপ রয়েছে। সকাল থেকেই যাত্রীদের প্রচ- ভিড় দেখা যায় শিমুলিয়াঘাটে। তবে দুপুরের দিকে চাপ কিছুটা কমতে থাকে। বিকালে পুনরায় যানবাহন ও যাত্রীসাধারণের ভিড় দেখা যায়।

মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ মো. হিলাল উদ্দিন জানান, শিমুলিয়াঘাটে প্রাইভেটকার, পিকআপ ভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহনের আধিক্য বেশি। হাজারো যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, ফেরি চলাচল সীমিত থাকায় বাংলাবাজার ঘাট এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের জট রয়েছে। শতাধিক ট্রাক আটকে থাকায় কাঁচামালে পচন ধরেছে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার কাঁচামালবাহী ট্রাক সঠিকভাবে পার হতে না পারায় দ্রব্যমূল্যে প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। সকাল থেকেই বাংলাবাজার ঘাটে ঢাকাগামী যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। দুপুরের পর ছিল উপচেপড়া ভিড়।

এদিকে শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার ঘাটে আসা প্রতিটি ফেরি ছিল যাত্রী ও যানবাহনে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। যাত্রী চাপে যানবাহন কম নিয়েই পার হতে বাধ্য হয় ফেরিগুলো। লঞ্চ বন্ধ থাকলেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা স্পিডবোট ও ট্রলারে পারাপার হন শত শত যাত্রী। ঘাট এলাকায় এসে ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ বিকল্প যানবাহনে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে তারা গন্তব্যে রওনা হন। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় পৌঁছতে ৪ গুণেরও বেশি ভাড়া গুনছেন তারা। ঢাকা থেকে শিমুলিয়া ঘাটে পৌঁছতে তিন থেকে চার গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

আবার স্পিডবোটে পদ্মা পার করে দিতে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪শ থেকে ৫শ টাকা, ট্রলারে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে দেড়শ টাকা। ঘাটে নেমে ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলে বরিশালে ৫শ থেকে ৬শ টাকা, গোপালগঞ্জে ৫শ টাকা, খুলনায় ৭শ টাকা, মাদারীপুরে ২শ টাকা, বাগেরহাট ৬৫০ টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে।

সপরিবারে বরিশালগামী যাত্রী ইউসুফ মিয়া বলেন, ঢাকা থেকে ঘাটে পৌঁছতেই পকেটের টাকা ফুরিয়ে গেল। পরে আবার বিকাশে টাকা এনে বরিশাল রওনা দিচ্ছি। বাসে বরিশাল ভাড়া ১৮০ টাকা, আর সিএনজি নিচ্ছে ৫শ টাকা।

খুলনাগামী যাত্রী রুমা আক্তার বলেন, ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। করোনা বাড়ার ভয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি।

কাশেম মিয়া নামের তরমুজ ব্যবসায়ী বলেন, তিন গাড়ি তরমুজ নিয়ে তিন দিন ধরে ঘাটে আটকা, ঢাকা যাব, বেলা ১টা পার হইছে। বাকিগুলো আটকা। তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। এ কেমন আইন কাঁচামালও আটকে রাখে। এতে জনগণেরও লস, ব্যবসায়ীদেরও লস।

বিআইডব্লিউটিসির বাংলাবাজার ঘাট ম্যানেজার মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ফেরি চলাচল সীমিত করায় ঘাটে ট্রাকের সারি দীর্ঘ পড়েছে। আর জনগণকে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানানোর চেষ্টা করছি।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, গতকাল দুপুরে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বাংলাদেশ হ্যাচারি পর্যন্ত চার কিলোমিটার এলাকায় ৪ শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক পারের অপেক্ষায় আটকে ছিল। ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বসে থেকেও ফেরির নাগাল পাচ্ছেন না চালকরা। এতে করে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিতে না পারায় ও প্রচ- গরমে ভোগান্তিতে পড়েছে ট্রাকচালকরা।

ঢাকা থেকে আসা ফরিদপুরের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকা শহরে লকডাউনের কারণে সব কিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মাইক্রোবাসে ৮০০ টাকা ভাড়া দিয়ে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত এসেছি। ওখান থেকে ফেরিতে পার হয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে আসলাম। এখান থেকে কীভাবে যাব সেটাই ভাবছি।

বিআইডব্লিটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ জানান, লকলাউনের খবরে সবাই যার যার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ছুটছে। যে কারণে নদীর দৌলতদিয়ায় পণ্যবাহী ট্রাকের সারি তৈরি হয়েছে। তবে ১৫টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। এ ছাড়াও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ যাত্রী ও অ্যাম্বুলেন্স পার করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ জন্যই ঘাট এলাকায় যানজট হচ্ছে।

এই রকম আরো কিছু খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button