সক্ষমতা নেই, তবুও অনলাইনে সক্রিয় নব্য জেএমবির সদস্যরা

ঢাকা: নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা নানা কৌশল অবলম্বন করেই চলছে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নতুন কর্মী সংগ্রহ, মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতে অনলাইনের বিভিন্ন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করছে।

যদিও বর্তমানে এসব জঙ্গি সংগঠনগুলো অনেকটাই নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়েছে। তবুও অনলাইনে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে সক্রিয় থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনকে বিস্তৃত করতে রোহিঙ্গা ক্যাস্পগুলো পরিদর্শন করেছেন তারা।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অনলাইনে প্রতিনিয়ত মনিটরিং করে চলছে। এর ফলে জঙ্গি সংগঠনগুলোর অনেক সদস্য গ্রেফতারও হয়েছে। এরপরেও কিছু জঙ্গি সদস্য ‘হিজরত’ করতে দেশ ছেড়েছেন। অনলাইন ব্যবহার করে নাশকতার উদ্দেশে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন জঙ্গি সদস্যরা। হামলা বা নাশকতার সক্ষমতা না থাকলেও সংগঠনকে পুনর্গঠন করতে অনলাইনে সক্রিয় রয়েছে নব্য জেএমবির সদস্যরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, দেশে বড় কোনো হামলা বা নাশকতা ঘটানোর সাংগঠনিক সক্ষমতা জঙ্গি সংগঠনগুলো নেই। তবে জঙ্গি সদস্যরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। নব্য জেএমবিকে পুনর্গঠন করতে ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থের যোগানে আনলাইনে এক্টিভ রয়েছে জঙ্গি সদস্যরা। এদিকে তাদের কার্যক্রম প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মনিটরিং অব্যাহত রেখেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানায়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন জঙ্গিকে (নব্য জেএমবি) জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, তাদের অনেক বন্ধু কথিত হিজরতের নামে আফগানিস্তান গিয়েছে। তারা ভারত ও পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান পৌঁছেছে। অনেক যুবক ‘হিজরতের’ নামে গ্রুপ করে তালেবানের ডাকা সাড়া দিয়ে আফগানিস্তানে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে তারা তালেবানদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। তালেবানদের সঙ্গী হয়ে সেখানে যুদ্ধ করবে। গ্রেফতার নব্য জেএমবির সদস্যরা ছবি দেখে একজনকে শনাক্ত করেছে। আমরা জানতে পেরেছি ওই যুবকের নাম রাজ্জাক। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেখানে অনেক যুবক যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি সদস্যরা জানিয়েছে।

এর আগে, রাজধানীর গুলিস্তান, মালিবাগ ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ সাইনবোর্ড এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সসহ কয়েকটি বোমা হামলা ও নাশকতার ঘটনাও ঘটিয়েছে নব্য জেএমবির সদস্যরা। তারা এসব হামলার জন্য যে বোমা তৈরি করেছিলো তাও অনলাইনে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দিয়েছিলো সংগঠনের কয়েকজন প্রশিক্ষক। অবশ্য পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ওই সব হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকা জঙ্গি সদস্যদের গ্রেফতারে সক্ষম হয়েছে।

সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা জানায়, এসব হামলা চালিয়ে নব্য জেএমবি তাদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে চেয়েছিল। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টার্গেট করে এসব হামলা চালিয়েছিল। এভাবেই প্রতিনিয়ত তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তবে বড় হামলার সক্ষমতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বর্তমানে নব্য জেএমবিসহ অন্যসব জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেই।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। দেশের ৫০০ স্পটে এই সিরিজ বোমা হামলায় দু’জন নিহত এবং অন্তত ১০৪ জন আহত হন। সিরিজ বোমা হামলার ওই ঘটনার পর সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে এই ঘটনার ১৬ বছরে পুলিশ সবকটি মামলার প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে ১৫৯টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৮টি, সিএমপিতে ৮টি, আরএমপিতে ৪টি, কেএমপিতে ৩টি, বিএমপিতে ১২টি, এসএমপিতে ১০টি, ঢাকা রেঞ্জে ২৩টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৭টি, খুলনা রেঞ্জে ২৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ৭টি, সিলেট রেঞ্জে ১৬টি, রংপুর রেঞ্জে ৮টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬টি ও রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়।

২০০৫ সাল থেকে চলতি বছরের (২০২১) ১৬ আগস্ট পর্যন্ত- এসব মামলার মধ্যে ১৪৩টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়। বাকি ১৬টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করতে না পারায় চুড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দেওয়া হয়। মামলাগুলোতে ১৩০ জন এজাহারনামীয় আসামি ছিল। বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে মোট ৯৬১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছিল এক হাজার ১৩১ জনকে। অভিযোগপত্রের আসামিদের মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছিল এক হাজার ২৩ জনকে। আসামিদের মধ্যে ৩২২ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। ১৫ জনের ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এদিকে,ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি)শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর পুলিশ জঙ্গি সংগঠনগুলোকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। হঠাৎ করে কী হলো, ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপ হলো। এক পর্যায়ে আইএস এর উদ্ভব হলো। তখন আবার বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফায় আইএস ভাবাদর্শের জঙ্গি সংগঠন গড়ে উঠল। নব্য জেএমবিসহ অনেকগুলো জঙ্গি সংগঠন। বাংলাদেশে যখনই কোনো জঙ্গি সংগঠনের উদ্ভব হচ্ছে, সেটা আন্তর্জাতিক কোনো প্রেক্ষাপটেই উৎসাহিত হয়ে তারা সংগঠনগুলো তৈরি করছে।

তিনি বলেন, এখন যেটা আশঙ্কার বিষয়, তালেবানরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেওয়ার পরেই তারা ঘোষণা করেছে পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকাকে যুদ্ধে পরাজিত করে আফগানকে স্বাধীন করেছি। এতে যুবক তরুণদের মধ্যে একটা উৎসাহ তৈরি হবে। এটার একটা ঢেউ আমাদের উপমহাদেশের দেশেগুলোতে লাগবে। এজন্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।

১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা মামলা প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আদালত বন্ধ হওয়ার কারণে ঢাকার মামলাগুলোর মধ্যে পাঁচটি মামলা এখনও বিচারাধীন আছে।

এদিকে র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যা ব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলানিউজকে বলেন, সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে জেএমবি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলো। এরপর জেএমবির প্রথম সারির নেতাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হই। আমরা ১৫৯টি মামলা ৬৭ জন আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হই। এসব মামলা অধিকাংশ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আমরা নিয়মিত মনিটর করছি। পাশাপাশি আমাদের দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগযোগ রাখছি। কেউ অনলাইনে কোনো নাশকতার কার্যক্রম চালাচ্ছে কিনা বিষয়টি মনিটরিং করতে র্যা বের সাইবার টিম প্রতিনিয়ত কাজ করছে।

সম্প্রতি আফগানিস্তানের পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা গভীরভাবে নজরদারি মধ্যে রেখেছি। এই প্রেক্ষাপটের মধ্যে দিয়ে আমাদের দেশের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে তাদের (তালেবান) মতবাদ দেখা যায়কি না, সে বিষয়ে র্যা বের নজদারি রয়েছে। পাশাপাশি আমরা সাইবার ওয়াল্ডে নজরদারি করছি।

জেএমবি’র আদ্যপান্ত:
১৯৮৮ সালে শায়খ আবদুর রহমান জেএমবি প্রতিষ্ঠা করলেও প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পর ১৯৯৮ সালে জেএমবি দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তবে দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু হয় ২০০৩ সালের প্রথমদিকে। পরে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা ও ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারককে হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে এই জঙ্গি সংগঠনটি।

এরপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের পর জেএমবির শুরা কমিটির প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান, অপারেশন কমান্ডার আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহসহ শীর্ষ ৬ জনের ফাঁসি ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ কার্যকর হওয়ার পর আত্মগোপনে যায় সংগঠনের অন্য নেতাকর্মীরা। পরে সংগঠনে নেতৃত্বের সংকট থাকায় জেএমবি সংগঠনটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পুরাতন জেএমবি ও নব্য জেএমবি। পুরাতন জেএমবি ছোটখাটো নাশকতা করে সংগঠনটি সচল রাখতে চাইলেও নব্য জেএমবি চুপচাপ তাদের সাংগঠনিক ও আর্থিক শক্তি বাড়ানোর কাজ করতে থাকে। যার প্রতিফলন ঘটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরায় জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়ে। এর ঠিক সপ্তাহখানেক পর ৭ জুলাই শোলাকিয়ার ঈদগাহে আরও একটি হামলা চালায় নব্য জেএমবি। এই দুটি জঙ্গি হামলার পর অনেকটা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা জঙ্গি আস্তানার সন্ধান করতে থাকে এবং নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতাদের খোঁজে অভিযান পরিচালনা করতে থাকে পুলিশের কাউন্টার টোরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব)।

এরপর রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন জঙ্গি আস্তায় অভিযান চালিয়ে জেএমবি’র শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মুখে নব্য জেএমবি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। শীর্ষ জঙ্গিদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। অনেকে আবার ধরা পড়েছে।

এই রকম আরো কিছু খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button