হাফিজুর রহমান:
বাংলাদেশের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ বা জাগুক এর মধ্যে অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ‘লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য’ সম্পর্কে এ সংক্রান্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে বারবার উল্টো চলার নীতি প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে অভিযোগেরও অন্ত নেই। একজনের জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি, টাকা না পেলে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, জালিয়াতির মাধ্যমে প্লট ভাগাভাগিসহ নানা অভিযোগ খোদ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠলেও অভিযুক্তরা বার বার নানা কারিশমায় পার পেয়ে যান। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হুঙ্কার হলেও কার্যত তা ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত হয়। সম্প্রতি এমন এক চক্রের সন্ধান মিলেছে, যারা জালিয়াতির একাধিকঘটনায় জড়িত থাকার পরও রয়েছেন ধরা ছোয়ার বাইরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মিরপুর হাউজিং এস্টেটে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ একর জমি রয়েছে। এসব জমিতে কয়েক হাজার প্লট রয়েছে। স্বাধীনতার আগে থেকে সেখানে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক প্লট এখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। খালি প্লটের অনেকগুলো দখল করে লোকজন দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। এমন প্লটের নথি জাল হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশের পরও রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ বারবার এড়িয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জালিয়াতকারীরা হয়েছে আরো বেপরোয়া।
জাগৃকের সূত্রে জানা যায়, নথি জাল হওয়া প্লটের একটি মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ১০ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ৮/২ নম্বর প্লট। সেই নথি অনুযায়ী, প্লটটি ১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর নূরবানুর নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এমপি-৩৬৩/৮৭/৫১৪৪/স্মারকে ১৯৯৫ সালের ৪ মে ওই বরাদ্দ বাতিল করে ১৩ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের প্রথম লেনের ৩০ ও ৩২ পুনর্বাসন প্লটটি তাঁর নামে বরাদ্দ হয়। এর মূল নথি গায়েব করে জাল নথি তৈরি করে চক্রটি। নথির সবখানে ইস্যু নম্বর তৈরিসহ ঘষামাজা করে বরাদ্দপত্র জারি করা হয়। প্লটটির বাস্তব দখল দায়মুক্তি ও নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিবেদনও জাল করা হয়েছে। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর একটি লিজ দলিল (নম্বর ১১৩০১) সম্পাদন করা হয়। ৩১১জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ
দশমিক ৩৩ বর্গগজ বা প্রায় চার কাঠা আয়তনের প্লটটি নিয়ে জালিয়াতিতে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৮ নম্বর রোডের ৫ নম্বর প্লটের ক্ষেত্রেও জালিয়াতি হয়েছে। প্লটটি ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট মোকাররম হোসেনকে বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে দেখানো হয়। এটি বাতিল করে ১৯৯৩ সালের ২ অক্টোবর তাঁর নামে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বিকল্প হিসেবে ২ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ১ নম্বর রোডের ৫ নম্বর প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। নানা ধাপে জালিয়াতি করে তৈরি নথিটির সব কার্যক্রম জটিলতার কারণে বন্ধ রেখেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জালিয়াত চক্র মূল নথি গায়েব করে জাল নথি তৈরি এবং তাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে চলতি বছরের শুরুতে দলিল রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেয়। পাঁচ কাঠার এই প্লটের জন্য সরকার রাজস্ব পেত কমপক্ষে দুই কোটি টাকা। টাকা জমা না দিয়ে রসিদও জাল করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, এসব জালিয়াতি ধরা পড়ায় জাগৃকের প্রধান দপ্তরসহ সব বিভাগে নড়াচড়া শুরুর পর সম্প্রতি মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ১১ নম্বর লেনের ৯ নম্বর প্লটের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এমন ঘটনা। এ প্লটের বরাদ্দগ্রহীতা রওশন আরা খানম। এ-সংক্রান্ত জাল নথি দিয়ে সরকারি কোষাগারে কোনো টাকা পরিশোধ না করেই ভুয়া দায়মুক্তিপত্র তৈরি করা হয়। গত বছরের ৩ এপ্রিল প্লটটির দলিল
রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয়; যার নম্বর ২৮৪৯। এমন জালিয়াতির ঘটনা রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি।
অভিযোগ উঠেছে, চক্রের মূল হোতা সঙ্গে জাগৃকের অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহিন। তিনি সিবিএ নেতা হিসেবে বিগত সরকারের আমলে ছিলেন দাপুটে। সরকার বদলের পর বোল পাল্টে এখনো অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন। চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ থাকলেও সেটি ফাইলবন্দি হয়ে আছে। এ নিয়ে সবিস্তার থাকবে পরবর্তী সংখ্যায়।
সিবিএ নেতা পরিচয়কারী শাহীনকে ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে পাওয়া যায়নি
দ্বিতীয় পর্ব . পেতে ভোরের বাংলাদেশের চোখ রাখুন
