ভোরের বাংলাদেশ প্রতিবেদক:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
জনাব তারেক রহমান সাহেবের কাছে খোলা চিঠি
গত ৩রা মার্চ ২০২৫ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান সাহেবের পক্ষ থেকে বিজ্ঞ ওলামাদের নিকট একটি অনুরোধ ছাপা হয়েছে । যাতে তিনি খ্রিস্টানদের বড়দিনের মতো সারা বিশ্বে রোজা এবং ঈদ একই দিনে একসাথে করা যায় কিনা উলামাদের কাছে বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
এক্ষেত্রে আমি জনাব তারেক রহমান সাহেবের সমিপে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যদি তিনি বিষয়গুলো সঠিকভাবে চিন্তা করেন তাহলে অবশ্যই রোজা ঈদ পালনের ক্ষেত্রে ইসলামের সঠিক বিধান বুঝতে পারবেন ইনশাআল্লাহ এবং সেই সাথে যে সকল ভাইয়েরা এখনো রোজা ঈদ পালনের ক্ষেত্রে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছেন তারাও বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
(এক) আমি প্রথমেই জনাব তারেক রহমান সাহেবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, যে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উলামাদের কাছে বিষয়টি ভাবার জন্য, আলোচনা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
(দুই) খ্রিস্টানদের সাথে আমাদের এবাদতের কোন তুলনা চলে না। কারণ তাদের বড়দিন তাদের বানানো বিষয়। আমাদের রোজা- ঈদ হল আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট এবাদত। যা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। যা আগে কিংবা পরে করার কোন সুযোগ নেই।
(তিন) খ্রিস্টানরাও বড়দিন সমগ্র পৃথিবীতে একই সাথে পালন করতে পারেনা। কেননা ১৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা (যেখানে ইন্টারন্যাশনাল ডেড লাইন রয়েছে) পূর্বে এবং পশ্চিমে দুইটি তারিখ এবং দুইটি বার থাকে। তাহলে একই সময়ে
উক্ত দেশগুলোতে বড়দিন উদযাপিত হয় না।
এতে বুঝা যায় পূর্ণ পৃথিবীতে একটি তারিখ বিদ্যমান থাকে না; বরং দুটি তারিখ বিদ্যমান থাকে।
যদি সৌর হিসাবে পৃথিবীতে দুটি তারিখ বিদ্যমান থাকা যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক হয়ে থাকে তাহলে চন্দ্রের হিসাবে একই পৃথিবীতে দুই তারিখ থাকা অযৌক্তিক এবং অবৈজ্ঞানিক হবে কেন? বিষয়টি কি ভেবে দেখার নয়?
(চার) সারা বিশ্বের মুসলমানগণ নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে রোজা-ঈদ পালন করে থাকেন, আর এটিই শরীয়তের বিধান।
(পাঁচ) সৌদি আরব এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের মানুষেরা অন্য কোন দেশের চাঁদের সংবাদ কখনই গ্রহণ করে না। যেমন ১৪৪৩ হিজরী মোতাবেক ২০২২ খ্রিস্টাব্দ আফগানিস্তান, নাইজার এবং মালিতে রমজানের ২৯ তারিখে ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে।
১ লা মে এই তিন দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশ তাদের সংবাদকে গ্রহণ করে ঈদ উদযাপন করেনি। তাহলে বোঝা গেল সৌদি আরবসহ কোন দেশই অন্য দেশের চাঁদের সংবাদের উপর ভিত্তি করে রোজা-ঈদ পালন করে না।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চাঁদপুরের কয়েকটি গ্রামে ঈদ উদযাপিত হয়েছিল। “আফগানিস্তানের সঙ্গে মিল রেখে চাঁদপুরের দুই গ্রামে ঈদ” গুগলে এ শিরোনামে সার্চ করলে পূর্ন সংবাদ জানা যাবে।
(ছয়) সমগ্র পৃথিবীতে একসাথে বা একই দিনে রোজা-ঈদ পালন করতে হলে কিছু অসুবিধা মেনে নিতে হবে অথবা নবীজির হাদীস শরীফ পরিহার করতে হবে। যা আমাদের জন্য অসম্ভব।
যে অসুবিধা গুলো মেনে নিতে হবে তা হচ্ছে-
(ক) যখন সৌদি আরবে সন্ধ্যা ৭টায় চাঁদ দেখা যাবে তখন তার পূর্বের দেশসমূহে রাত থেকে গভীর রাত। বাংলাদেশের রাত ১০ টা, জাপানে রাতের ১ টা এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে ভোর রাতের ৪ টা । তাহলে এ সকল দেশের মানুষের জন্য তারাবির নামাজ এবং সেহরি খাওয়া ইত্যাদি বিষয় আদায় করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
পক্ষান্তরে সৌদি আরবের পশ্চিমের দেশ সমূহে তখন দিন। তাহলে তারা সৌদি আরবের চাঁদের সংবাদ ঐ মুহূর্তে কিভাবে মান্য করবে?
(খ) আর যদি আপনি বলেন বিজ্ঞানের এই যুগে চাঁদ দেখার কোন প্রয়োজন নেই, জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে অমাবস্যার পর থেকে হিসাব করে চাঁদের গণনা শুরু করে রোজা ঈদ পালন করবো।
তাহলে তা সরাসরি নবীজির বলে দেওয়া রোজা ঈদ পালনের মূলনীতি সম্বলিত হাদিস কে উপেক্ষা করা হবে।
কেননা, হাদীস শরীফে এসেছে- তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ছাড়। মেঘ ইত্যাদির কারণে যদি চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে মাস ৩০ দিনে পুরা করো। সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৯০৯)
নবীজি কিন্তু এটা বলেন নাই যদি মেঘ ইত্যাদির কারণে চাঁদ দেখা না যায় তাহলে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পারদর্শী লোকদেরকে জিজ্ঞেস কর।
পরিশেষে আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি, রোজা-ঈদ পালনের ব্যাপারে আমরা একটি নকশা তৈরি করেছি। যাতে চন্দ্রের কক্ষপথ এবং অন্যান্য দেশের সাথে সময়ের ব্যবধান ইত্যাদি রয়েছে। এর মধ্যে চিন্তা করলে বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হবে ইনশাআল্লাহ।
সর্বশেষ আপনার কল্যাণ কামনায় বলছি- বাংলাদেশের বহু মানুষ আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, তাই ধর্মীয় মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে হাক্কানি ওলামায়ে কেরামের উপর নেস্ত করে দেওয়াই উত্তম। তাহলে আমাদের সকলের ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে, দেশ ও জাতি সঠিক পথ পেয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ । আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমীন।
দোয়াপ্রার্থী
ওলামায়ে কেরামের পক্ষে-
জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুস
শিক্ষক, লালবাগ মাদ্রাসা ঢাকা
খতিব,আজিমপুর ছাপড়া মসজিদে ঢাকা খাদেম,দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশ
