ভোরের বাংলাদেশ:
আমাদের অফিস সহকারী রাশেদ মাঝে মাঝে এমন সব প্রশ্ন করে যে, আমি আকাশ থেকে পড়ি। হঠাৎ গতকাল রাশেদ জিজ্ঞাসা করলো, স্যার আল্লাহ তো মানুষ ও জিন দুটোকেই সৃষ্টি করেছেন। তাহলে জিন অদৃশ্য হতে পারে কিন্তু মানুষ অদৃশ্য হতে পারে না কেন ?
আমি বললাম, আল্লাহ মানুষ ও জিন উভয়কে সৃষ্টি করেছেন ঠিকই কিন্তু আমাদের সৃষ্টিগত উপাদানের ভিন্নতার কারণেই এই ক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা। আল্লাহ জিনকে ধোঁয়াবিহীন আগুনের শিখা বা “মারিজ মিন নার” থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর মানুষকে আল্লাহ মাটি বা কাদা থেকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ মাটির তৈরি হওয়ার কারণে মানুষের শারীরিক অস্তিত্বের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে, যা দৃশ্যমান এবং নির্দিষ্ট আকার ও অবকাঠামোযুক্ত।
রাশেদ তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে তার কাজে ফিরে গেলেও, আমার জীবনে জিনের সাথে ঘটে যাওয়া সত্য একটা ঘটনা আমাকে বিস্মিত করে, যা এখনও আমার মনে হলে শরীরে ভয়ের শিহরণ অনুভূত হয়।
আমার গ্রামের বাড়ি রাজশাহী জেলার বাগমারা থানায় হওয়ার সুবাদে, অনেক সময় ঢাকা টু রাজশাহী যাওয়ার পথে পুঠিয়া বাসট্যান্ডে নেমে, তাহেপুর হয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে যেতে হয়। ঘটনাটা ২০১০ সালের দিকে। আমি পুঠিয়া বাসট্যান্ডে নামার পর আমার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রাত্রী প্রায় ১২ টা, সে সময় তেমন কোনো পরিবহণ না থাকার কারণে একমাত্র মানুষ চালিত ভ্যান গাড়িগুলোই ভরসা ছিল এবং আমিও যথারীতি ভ্যান গাড়ি নিয়েই রওনা হলাম। জুন জুলাই মাস হওয়ায় যেকোনো সময় বৃষ্টি হওয়াটা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমি পুঠিয়া থেকে রওনা দেওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। রাস্তার পাশে একটা মুদি দোকান খোলা ছিল, সেখান থেকে একটা পলি নিয়ে মাথায় দিয়ে ভ্যানওয়ালার সাথে গল্প করতে করতে সামনে যেতে থাকলাম। নওপাড়া বাজারে পৌঁছানোর কিছুটা আগে, এক বা দেড় কি.মি. রাস্তায় তখন তেমন কোন বসতি বা দোকানপাট ছিল না। এই এক বা দেড় কি.মি. রাস্তার দুপাশে তখন আখ ক্ষেত এবং দু-একটা কলা বাগান চোখে পড়তো। এখনকার বাস্তব চিত্র আমার জানা নেই। তো এই রাস্তার দুই পাশে আখ ক্ষেত এবং দু একটা কলা বাগান, এখানে রাস্তার দুই পাশে অথবা একপাশে, ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে তাহেরপুর যেতে হাতের বাম পাশে হবে, অবশ্যই একটা বয়লার বা ধান হতে চাল বানানো যায় এরকম একটা চাতাল ছিল। ঐ জায়গায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ-ই আমি যে ভ্যান গাড়িতে যাচ্ছিলাম, সেই ভ্যান গাড়ীটার চেইন ছিড়ে গেল এবং ভ্যান চালক আমাকে শুধু পায়ে ঠেলে তাহেরপুর পর্যন্ত নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালে, আমি নিরুপায় হয়ে ঐ চাতালের ওখানেই ভ্যান থেকে নেমে যেতে বাধ্য হলাম।
আমার এখনো মনে আছে, ঐ চাতালের সাথে একটা বারান্দা টাইপের টিনের চালা ছিল, যেখানে একটা ইলেকট্রিক বাল্বও লাগানো থাকতো আর ঐ বাল্বের কারণে সামনে পিছনে প্রায় এক দেড়শো গজ রাস্তা মোটামুটি ভালোভাবেই দেখা যেতো। আমি যখন ঐ চাতালের ওখানে নেমেছি, তখনও ঝিরিঝিরি আকারে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি তাহেরপুরগামী যেকোনো পরিবহণের আশায় ঐ চাতালের ওখানেই অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমি যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি তার ঠিক পিছনেই একটা ছোটো বাচ্চা কান্না করছে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাচ্চার কান্না খুব স্পষ্ট হতে থাকলো এবং আমার কানে ঐ বাচ্চার কান্নার শব্দ খুব জোরে জোরে আঘাত করছিল বিধায় আমি পিছন ফিরে চাইলাম। সত্যিই তাই, ছোটো একটি বাচ্চা আমার ঠিক কাছেই কান্না করছে। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, বাচ্চাটি ছাই কালারের একটি পুরাতন টি-শার্ট এবং নেভি-ব্লু কালারের একটা হাফপ্যান্ট পরে ছিল। ছোটো থেকেই আমি খুবই সাহসি বটে কিন্তু অত্যান্ত নরম মনের মানুষ বিধায় বাচ্চাটির কান্না আমার হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছালো এবং আমি নিজে থেকে বাচ্চাটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমিই প্রথমে বাচ্চাটিকে জিজ্ঞাসা করলাম-
: তুমি কে বাবা, আর এত রাতে কোথা থেকে তুমি এখানে এলে ? আর কেনই-বা কান্নাকাটি করছো ?
: আপনি আমাকে চিনতে পারেননি আঙ্কেল ?
: না বাবা, আমি তো তোমাকে চিনতে পারিনি!
: কেন আঙ্কেল, আমাদের বাড়ি নওপাড়া বাজারের পাশেই, রাস্তার সাথে। আমার বাবা ভ্যান চালক, কয়েকদিন আগেও তো আপনার বাইক লিক (Leak/Puncture) হলে আপনি আমাদের বাড়িতে আপনার বাইকটা রেখে, আমার বাবার ভ্যানে চড়ে পুঠিয়া বাজারে গিয়েছিলেন।
ঘটনাটা আমার মনে পড়লো। ঘটনাটি সত্য এবং বেশ কয়েকদিন আগে ঘটনাটি সত্যিই সত্যিই আমার জীবনে ঘটেছে। বাচ্চাটির এই কথাগুলোর কারণে তার প্রতি আমার বিশ্বাস আরও বেড়ে গেল এবং আমি সত্যি সত্যিই তার উপকারের জন্য মনস্থির করলাম।
: বল তোমার জন্য আমি কী করতে পারি ?
: আপনি কি আঙ্কেল নওপাড়া বাজারের ঐ দিকে যাবেন ?
: হ্যাঁ, আমি তো ঐ দিকেই, তাহেরপুর পর্যন্ত যাবো।
: আমাকে কি সাথে করে নিয়ে যাবেন আঙ্কেল ? আমাদের বাড়ির সামনে আমাকে ছেড়ে দিলেই হবে!
: ঠিক আছে, তুমি আমার সাথে যেতে পারো!
আমি বাচ্চাটিকে সাথে নিয়ে রওনা দিবো, ঠিক এমন সময় আমার মনের মধ্যে একটু খটকা হলো। আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, এত রাতে এই ৮/১০ বছরের একটা বাচ্চা এখানে আসলো কীভাবে, আর সে কেন আমার সাথে যেতে চাচ্ছে ? আমি যখন ভ্যান গাড়ী থেকে নামি তখন তো কোন বাচ্চাকে ঐ চাতালের বারান্দায় দেখিনি! এমনকি, আমি বারান্দায় দাঁড়ানোর সময়ও কোন বাচ্চার কান্না আমার কানে আসেনি। আমি ভেতরে ভেতরে একটু করে ভয় পাচ্ছিলাম। আবার বাচ্চাটির বর্ণনা আমার জীবনে ঘটে যাওয়া অল্প কিছু দিনের অতীত এবং সত্য একটা ঘটনা বিধায় বাচ্চাটিকে অবিশ্বাসও করতে পারছিলাম না। আমার চৈতন্য ভেঙ্গে বাচ্চাটিই আমাকে জিজ্ঞাসা করলো-
: কী আঙ্কেল, কোনো সমস্যা ?
: না কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা তুমি এতো রাতে এখানে এলে কী করে ?
বাচ্চাটি এবার হাসলো! আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বাচ্চার দাঁতগুলো ধুসর বর্ণের আর জিহ্বা অতিরিক্ত লাল। আমি আবারও ভয় পাচ্ছিলাম দেখে বাচ্চাটি আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে বললো-
: আপনি ভয় পাবেন না আঙ্কেল, আমি আমার বাবার সাথে পুঠিয়ার দিকে যাচ্ছিলাম। আমার ফুফু ঢাকায় চাকরি করে, উনি আজকে আসবে তো, তাই বাবা আমার ফুফুকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পুঠিয়া গেছে।
: তাহলে তুমি এখানে কী করছো বা তোমার বাবা তোমাকে কেন এখানে রেখে গেলো ?
: ও এই কথা, আমাদের ভ্যান গাড়িটা না লিক হয়ে গেছে, তাই বাবা আমাকে এখানে রেখে গেছে, বাবা পুঠিয়া থেকে যাবার সময় আমাকে নিয়ে যাবে!
: তাহলে তুমি এখানে কান্না করছিলে কেন ? আর আমি যখন এখানে আসলাম তখন তোমাকে তো আমার চোখে পড়লো না মনে হয় ?
: ও, আপনি যখন বারান্দায় উঠলেন, আমি তখন প্রস্রাব করার জন্য পিছনের দিকে গিয়েছিলাম। আর পিছনের দিকে অন্ধকার তো, তাই ভয় পেয়ে কান্না করছিলাম।
বাচ্চাটার কথা আমার বিশ্বাস হলো আর তাকে সাথে নিয়ে পথ চলতে শুরু করলাম। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, আমার সাথে হাঁটছিল ৮/১০ বছরের একটা বাচ্চা কিন্তু পায়ের শব্দে মনে হচ্ছিল কোনো যুবক ছেলে আমার সাথে হাঁটছে। আকাশে মেঘ থাকার কারণে পথ ঘাট কিছুটা অন্ধকার লাগছিল। তেমন কিছু দেখা যাচ্ছিল না, দআমি ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছিলাম আর জোরে জোরে হাঁটার চেষ্টা করছিলাম। ছেলেটা আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো-
: আঙ্কেল, আপনি কি আবারও ভয় পাচ্ছেন ? আর এত জোরে জোরে হাঁটছেন কেন ?
ঐ বাচ্চার এই বারের কথাটি একজন যুবক ছেলের মতো শুনালো, আমি পিছন ফিরে চাইলাম। দেখি অবাক কান্ড। ৮/১০ বছরের বাচ্চাটি দেখতে ১৫/১৬ বছরের যুবক (কিশোর) ছেলের মতো হয়ে গেছে। আমি এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম। আমার পকেটে মোবাইল ফোন ছিল, আমি মোবাইল ফোনটা বের করার চেষ্টা করলাম। সফল হলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমার মোবাইল ফোনটা অফ !!! আমি মোবাইল ফোন অন করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। আমি জোরে জোরে হাঁটার চেষ্টা করছি। ছেলেটি আবারও আমার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো-
: আপনি এখনও জোরে জোরে হাঁটছেন, তারমানে আপনি ভয় পাচ্ছেন। একটু আস্তে আস্তে চলেন! আমি ছোটো মানুষ, এতো জোরে হাঁটতে পারছিনা, আর ইতিমধ্যেই যদি আমার বাবা এসে যায়, তবে আমরা তার ভ্যানেই সামনে যাবো। আপনি চাইলে তাহেরপুর পর্যন্ত যেতে পারবেন।
আমি আরও ভড়কে গেলাম। কেননা এবারের কন্ঠ একজন পরিপূর্ণ যুবকের। আমি পিছন ফিরে চেয়ে দেখি ৮/১০ বছরের এই বালকটি আমার কাঁধ বরাবর, এর অর্থ এই যে, বালকটিকে প্রথমে ৮/১০ বছরের মতো দেখালেও সে এখন ২০/২২ বছরের তাগড়া একটা যুবক। এটা দেখার পর যত বড়ো সাহসী মানুষই হোক না কেন, তার ব্রেইন ঠিক মতো কাজ করার কথা নয় !!! আমারও তাই হলো। আমি ভয় পেয়ে দৌড়ানো শুরু করলাম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, বিষয়টি সত্যি সত্যিই কিছুটা স্বপ্নের মতো মনে হতে লাগলো। স্বপ্নে আমাদের কেউ তাড়া করলে আমরা যেমন দৌড়ে কুলাতে পারিনা, ব্যাপারটি ঠিক সেরকমই মনে হচ্ছিল। কিন্তু দৌড়ে আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, এই ব্যাপারটা আমি ভালোভাবে খেয়াল করতে পারলাম। তবে এটাও স্পষ্ট খেয়াল করলাম, ছেলেটি কিন্তু দৌড়াচ্ছিল না, বরং সে আমার সাথে জোরে হাঁটছিল বলে মনে হলো। আমি এইভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে নওপাড়া বাজারের আগের ব্রিজটা (এটা ছোট সাইজের একটা ব্রিজ, সম্ভবত এটাকে কালভার্ট বলে) পর্যন্ত আসার পর, পিছন ফিরে তাকালে ব্রিজের ১৫/২০ হাত আগে একটা দৈত্যাকার কিছু দেখতে পেয়েছিলাম এবং এরপর সামনে দৌড়ে গিয়ে নওপাড়া বাজারের কোন একটা জায়গায় আমি পড়ে যাই। আমার শরীর তখন ঘোরময়, ছন্দহীন শরীরের প্রতিটা অঙ্গ-প্রতঙ্গ, শরীরে অবচেতনতা, ভয়, ভেতরে অনেক মানসিক অস্থিরতা, সব মিলিয়ে অর্থহীন এক বাস্তবতা অনুভব করছি। যতদূর মনে পড়ে, পাশে একটা টিউবয়েল এবং নওপাড়া বাজারের দোকানদারদের বসার জন্য টিনের কয়েকটা শেড ছিল।
আমার জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পাই, উক্ত বাজারের নাইটগার্ড সহ আরও দু/একজন কেউ আমার মাথায় পানি দিচ্ছিল। দু-একটি অচেনা মুখ, সবাই দেখছে দূর থেকে, আর আমাকে জিজ্ঞসা করছিল, আমি কোথা থেকে কীভাবে এখানে এই অবস্থায় এলাম, আমি উপরের বর্ণনা দিলে তারা আমাকে জানিয়েছে ইতিপূর্বেও এরকম বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে এই এরিয়ায়। আমি বুঝলাম, এটাই হয়তো বাস্তবিক সত্যতায় জিনের উপস্থিতি আর কালো রাতের ছায়া, যেখানে দুষ্টু এক জিনের আনাগোনা ছিল বিদ্যমান।
লেখক, এইচ আর প্রফেশনাল এবং হেড অব এইচ আর হিসেবে আরএমজি সেক্টরে কর্মরত।
