শরীফ হোসেন শুভ:
নানা অভিযোগ, বিশেষ করে চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি ব্যতীত সব উপকমিটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটির নেতৃত্ব। সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ রবিবার সন্ধ্যায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন।
সংগঠনের ভাবমূর্তিতে ধস
সংগঠনের শুরুর সময় থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নিজেকে “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বাহক” হিসেবে তুলে ধরেছিল। শিক্ষার্থীদের অধিকার, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যে গঠিত এই সংগঠন সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা গুলশানে সাবেক এক নারী সংসদ সদস্যের পরিবারের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ। এ ঘটনায় সংগঠনের ছয়জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পুলিশ ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ, কর্মী সাকাদাউন সিয়াম ও সাদাবকে গ্রেপ্তার করে।
নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও ভিতরে বিভাজন
রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রিফাত রশিদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা দেখতে পেয়েছি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে অপকর্ম করছে। এসব কর্মকাণ্ড সংগঠনের মূল দর্শনের পরিপন্থী।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়েছে, এমনকি দুর্নীতির সাথেও যুক্ত হয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
নেতৃত্বের এমন স্বীকারোক্তি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও নেতৃত্বব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিয়েছে কিছু দুর্বৃত্তপন্থী সদস্য।
সাংগঠনিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে রিফাত বলেন, “আমরা বসে আলোচনার মাধ্যমে নতুন কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কার্যক্রম ভবিষ্যতেও বরদাস্ত করা হবে না।”
তবে এখনো স্পষ্ট নয়, সংগঠনটি তার আস্থাহীনতা ও নেতৃত্বহীনতা কাটিয়ে কীভাবে আবার সংগঠিত হবে।
বিশ্লেষণ: আদর্শ বনাম বাস্তবতা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই সংকট আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে উচ্চ আদর্শ, অন্যদিকে কিছু নেতাকর্মীর সুযোগসন্ধানী আচরণ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব সংগঠনটিকে একটি মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আদর্শ রক্ষার জন্য সাংগঠনিক ত্যাগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটি বহাল রেখে অন্যান্য ইউনিট স্থগিতের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে হলে সংগঠনটিকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নেতৃত্ব পুনর্গঠনের দিকেই মনোযোগ দিতে হবে।
উপসংহার
বর্তমানে সংকটে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এখন দেখার বিষয়, তারা আদর্শিক কাঠামো পুনঃনির্মাণ করে ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না, নাকি এটি তাদের অস্তিত্বের জন্য চূড়ান্ত হুমকি হয়ে উঠবে।
—
