বান্দরবানের সম্ভাবনাময় কফি ও কাজু বাদাম চাষ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এ প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো সাফল্য নেই বললেই চলে। বরং কৃষকদের অভিযোগ, প্রকল্পের নাম করে লুটপাট হয়েছে জনগণের টাকা।

২০২২ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কফি ও কাজুবাদাম চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তিন পার্বত্য জেলায়। এর মধ্যে বান্দরবানে বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ছিল- উন্নত জাতের কফি ও কাজুবাদামের চারা আমদানি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, নার্সারি স্থাপন, সার ও বালাইনাশক বিতরণ, পানির ট্যাংক ও ডিপ ইরিগেশন, প্রক্রিয়াকরণ মেশিন সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ ইত্যাদি।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। নেই চাষাবাদ, নেই সরঞ্জাম, নেই কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন। উপকারভোগী কৃষকদের অভিযোগ, রোপণের উপযুক্ত সময়ে তাদেরকে চারা দেয়া হয়নি। যার কারণে অসময়ে চারাগুলো রোপণ করায় অধিকাংশ চারা মারা গেছে। এছাড়াও বান্দরবানের কৃষকদের জন্য ৯২ টি পানির ট্যাংক বরাদ্দ থাকলেও দেয়া হয়েছে মাত্র ১২টি পানির ট্যাংক।
শুধু তাই নয়, বান্দরবানে বিরানব্বইটি পানির ট্যাংক স্থাপনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোথাও এ ধরনের অবকাঠামো দেখা যায়নি। এছাড়াও মূল্যবান কফি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণের দুটি মেশিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং উদ্বুদ্ধ করণের জন্য অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে নিয়ে না যাওয়ার কারণে কৃষকরা সঠিকভাবে বাগান পরিচর্যা করতে না পারায় প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই অধিকাংশ বাগান অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
কৃষকদের মতে, অসময়ে কিছু নিম্নমানের কফি-কাজু বাদামের চারা দেয়া হয়েছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে বিতরণ করা চারাগুলোর অধিকাংশই ছিল প্যাকেট ছেঁড়া ও মাটির ভাল্ব ভাঙা। সঠিক সময়ে সঠিক উপকরণ না পাওয়ায় অনেক চেষ্টা করেও তা বাঁচাতে পারেননি। তারা বলেন, ‘আমাদের আরো অনেক সুযোগ সুবিধা দেবার কথা থাকলেও তার বিন্দু মাত্রও দেয়া হয়নি। এসব চারা দেয়া হয়েছে শুধু মাত্র প্রকল্পের নামে জনগনের টাকা লুটের জন্য।’
বটতলীপাড়ার বাগান চাষি মংক্য মারমা জানান, তাকে দেয়া চারাগুলো অনেক পরিচর্যা করেও বাঁচাতে পারেননি তিনি। মাত্র ৩টি চারা বেঁচে আছে বাকিগুলো মারা গেছে। চারাগুলো নিম্নমানের হওয়ায় সব পরিশ্রম ও সময় বৃথা গেছে তার। এ প্রকল্প গুলো কৃষকদের উন্নয়নের জন্য নেয়া হয়নি। নেয়া হয়েছে দুর্নীতিবাজ কর্তাদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বলে যোগ করেন তিনি।
ময়ুর পাড়ার কফি ও কাজু বাদামের নারী চাষি মুইক্য চিং মারমা বলেন, ‘চারাগুলো অসময়ে দেয়া হয়েছে। যেসময় চারাগুলো দিয়েছে তখন বর্ষা শেষ। পানির ব্যবস্থাও করেনি। তাই চারাগুলো চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য আসলে প্রকল্প দেয়া হয়নি। দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র কর্তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য।’
রোয়াংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লা অং মারমা বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে আমার জানামতে উন্নয়ন বোর্ড থেকে একটি মিশ্র ফলের বাগান দেয়া হয়েছিল অনেক আগে। কফি ও কাজু বাদাম সর্ম্পকে আমি কখনও শুনিও নাই। কাউকে না জানিয়ে উন্নয়ন বোর্ড কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তা আমি জানি না। এগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে মনে করছি।’
রুমা ও রোয়াংছড়িতে প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা মাঠকর্মী অংথুই চিং মারমা বলেন, ‘৯২টি পানির ট্যাংক দেবার কথা থাকলেও আমাকে দিয়েছে মাত্র ১২টি। এগুলো রাস্তার পাশে যেখানে কমকর্তারা পরির্দশন করতে পারবে এমন এলাকায় দিতে বলেছে। আমিও পিডির কথামতো ১২টি ট্যাংক রাস্তার পাশে দৃশ্যমান এলাকায় দিয়েছি।’
এ সময় তিনি কফি ও কাজু বাদামে ব্যাপক অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পিডি স্যার আমাকে যা দিতে বলছে আমি তাই দিয়েছি, এর বেশি আমার দেয়ার এখতিয়ার নাই।’
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের কফি ও কাজু বাদাম প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. জসিম উদ্দিন অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘কিছুটা ত্রুটি হয়েছে, সঠিক সময়ে অনেক কিছু দেয়া সম্ভব হয়নি, তাই কিছু টাকা ফেরত পাঠিয়েছি। তবে প্রকল্পে কোনো অনিয়ম দুর্নীতি হয়নি। কমিটি করে সব এলাকায় কমিটির মাধ্যমে সবকিছু বিতরণ করা হয়েছে।’
