ভোরের বাংলাদেশ ডেস্ক: ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে এই উদ্বেগ জানানো হয়েছে। শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় প্রার্থীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় বাধা প্রদান, হত্যার হুমকি এবং প্রার্থীদের ওপর গুলির ঘটনা ঘটতে পারে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচন ঘিরে যে কোনো ধরনের সহিংস ও অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনা প্রতিরোধে গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে হবে। অবৈধ অস্ত্র সুষ্ঠু ভোটের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও জোরদার অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থীদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে হবে।
জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা আমাদের সময়কে বলেন, যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও সজাগ থাকতে হবে। যাতে তারা ইউনিফর্মধারী বাহিনীগুলোকে যে কোনো ঘটনার আগাম তথ্য দিতে পারে। এখন মাঠে পুলিশ, র্যাব, আনসারের পাশাপাশি বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আছে। তাদেরও নির্বাচন ঘিরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। সব জায়গায় ভিজিলেন্স বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী সভা, সমাবেশ অনুষ্ঠানের ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে জানাতে নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশনা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মেনে চলা উচিত। তা হলে সবার জন্য ভালো হবে। তখন পুলিশ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। বড় বাধা পেরিয়ে তফসিল হয়েছে। এখন সজাগ থাকার কোনো বিকল্প নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তাদের কর্মপরিধি আরও বেশি বৃদ্ধি করতে হবে। সামনের দিনগুলোয় আজকের মতো ঘটনা আর বেশি ঘটার আশঙ্কা আছে। সেটা মাথায় নিয়ে কাজ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, জুলাইযোদ্ধা হাদির ওপর দুর্বৃত্তদের গুলির ঘটনা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটা অশনি সংকেত। এর আগেও প্রার্থীর ওপর গুলির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের ওপর ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। তফসিলের আগে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোয় যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তা হলে হয়তো তফসিলের পর এ ধরেেনর ঘটনা আমাদের দেখতে হতো না। হাদির ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে হবে। দুর্বৃত্তরা যাতে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় করতে হবে। উদ্ধারের বাইরে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রার্থীদের নিরাপত্তায় নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা গত রাতে আমাদের সময়কে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে কোনো প্রার্থীকে জনসভা শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আমরা সে মোতাবেক প্রত্যেক প্রার্থী ও দলকে সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগ শুরুর আগে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানাচ্ছি। যাতে পুলিশ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সজাগ আছি। প্রার্থীদের নিরাপত্তার দিকটাও আমাদের মাথায় রয়েছে। কোনো প্রার্থী নিজের নিরাপত্তায় ঝুঁকির বিষয়টি আমাদেরকে জানালে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
ঢাকা-৭ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য প্রার্থী আলহাজ আব্দুর রহমান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণা করা হলো, একদিন পর আজ একজন প্রার্থীকে গুলি করা হলো। এ ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন।
গত ৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগর বিএনপি আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনার পর গতকাল আরেক প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনা ঘটল।
গত ২৭ নভেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত ১১টি গুলির ঘটনা ঘটেছে সারাদেশে। এ ঘটনায় ৯ জন নিহত হন। ২৭ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় এক য্বুককে অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখা যায়।
গত ৩০ নভেম্বর খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের বাইরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে দুজন নিহত হন। ১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর জুরাইনে গ্যাসপাইপ এলাকার জব্বারের গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে পূর্বশত্রুতার জেরে এক যুবক নিহত হয়। ২ ডিসেম্বর রাতে নরসিংদীর রায়পুরার চরাঞ্চলে এক জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে নোয়াখালীতে এক দোকানিকে গুলি করে মোটরসাইকেল, মুঠোফোন ও টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ৪ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় এক কৃষককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন।
৭ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফেসবুক পোস্টের নিচে মন্তব্যের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় যুবলীগের সাবেক এক নেতা গুলিবিদ্ধ হন। ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ছাত্রশিবিরের স্থানীয় এক নেতার বাবাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। ১১ ডিসেম্বর দুপুরে পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে এক মসলা ব্যবসায়ীকে দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যাই বেশি। এই ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে। সারাদেশে মোট ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে (ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা মহানগর মিলে) ঢাকাতেই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে লাল চিহ্নিত অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৪৬টি, হলুদ চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৫৯টি। এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৭ হাজার ৬৫৬টি। অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২৫ হাজার ১০৫টি। সংখ্যার দিক থেকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সবচেয়ে বেশি ঢাকায়।
