- নিজস্ব প্রতিবেদক—
গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ঢাকার অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিতর্কিত প্রকৌশলীদের আবারও কেন্দ্রীয় ও সংবেদনশীল দায়িত্বে বসানো হচ্ছে—যাকে অনেক কর্মকর্তা এক ধরনের ‘প্রশাসনিক স্যাবোটাজ’ বলেই মনে করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইডেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তারকে ঢাকা ডিভিশন-২–এ বদলি করা হয়েছে। এই ডিভিশনের আওতায় বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, গণভবনসহ একাধিক ভিআইপি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনিই ছিলেন ক্ষমতাসীনদের আস্থাভাজন এক কর্মকর্তা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফ্যাসিবাদী আমলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, গণভবন ও সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব পালন করা সুবিধাভোগীদের ঘুরে ফিরে আবারও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হচ্ছে। এতে প্রশাসনের ভেতর তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন
গণপূর্তের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজ ব্যাচে সপ্তম অবস্থানে থাকার পরও তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পালন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকার দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্বে বহাল ছিলেন।
আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ
ইডেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) ও থোক বরাদ্দের বড় অংশ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির ফাইলগুলো ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার কাজেও তাকে ব্যবহার করা হতো।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তার দায়িত্বকালীন সময়ে সম্পাদিত কাজ ও বিলের তদন্ত হলে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজের বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। চলতি অর্থবছরসহ বিগত কয়েক বছরে সংস্কার কাজ বণ্টনে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
বিশেষ করে বদলির ঠিক আগমুহূর্তে এপিপির আওতায় প্রায় ৯ কোটি টাকার কাজ তড়িঘড়ি করে অনুমোদন দিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে মাত্র এক মাসেই প্রায় ৯০ লাখ টাকা কমিশন গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
সচিবালয় সংস্কারের নামে অর্থ লোপাটের অভিযোগ
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদার ও কর্মকর্তা জানান, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভ্যন্তরে ৮টি ভবন সংস্কারের নামে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কাজ না করেই কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ দেখিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর অর্ধেক অর্থ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ভাগ করে নেন।
সাংবাদিক ম্যানেজ করার অভিযোগও
এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আরিফ এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ আমলে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লোকেশনে দায়িত্ব পালন করে অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন আব্দুস সাত্তার—এমন অভিযোগও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের দাবি
অভিযোগের পাহাড় থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা ডিভিশন-২–এ বদলি করায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া নিরর্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে তার কার্যালয়ে গিয়ে এবং মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোন প্রশ্ন উত্তর পাওয়া জায় নি ।
