হাফিজুর রহমান
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি কেবল অস্ত্র বা ক্ষমতায় নয়, বরং সেই বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা সৎ, পেশাদার ও সাহসী কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) রেজাউল করিম মল্লিককে ঘিরে সাম্প্রতিক যে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সংকট নয়—বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যই এক গুরুতর সতর্কবার্তা।
ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এমন একজন কর্মকর্তা, যিনি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠে উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকি করেন। দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধ দমনে দৃঢ় থাকার কারণে তিনি স্বার্থান্বেষী মহলের বিরাগভাজন হয়েছেন—এমন ধারণা অমূলক নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই দেশেই এর আগেও বহু সৎ কর্মকর্তা একই পরিণতির শিকার হয়েছেন।
একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হয়, তখন সেটি শুধু ওই কর্মকর্তার মনোবল ভাঙে না; বরং পুরো বাহিনীর ভেতরে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়। বার্তাটি হলো—সততা ও নিষ্ঠা নয়, বরং আপস ও নীরবতাই নিরাপদ পথ। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকের কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি দলীয় আনুগত্যের চেয়ে আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলেই বিভিন্ন সময়ে পদবঞ্চিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। অথচ অভিজ্ঞতা, মেধা ও পেশাদারিত্বে তিনি ছিলেন যোগ্যতমদের একজন। এটি প্রমাণ করে—ক্ষমতার পালাবদল হলেও প্রশাসনের ভেতরে কিছু পুরনো চর্চা এখনো রয়ে গেছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যক্তিগত জীবনের চরম প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি দায়িত্ব পালনে কোনো শৈথিল্য দেখাননি। স্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মধ্যেও নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন একজন কর্মকর্তার নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। এমন মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, ষড়যন্ত্র নয়।
প্রশাসনের অভ্যন্তরে যদি সত্যিই কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত স্বার্থে একজন সৎ কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করতে চায়, তবে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; বরং অপশক্তিকে উৎসাহ দেওয়ার শামিল।
এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের করণীয় হলো—অপপ্রচারের উৎস চিহ্নিত করা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের পাশে রাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে। নতুবা একদিন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে সৎ কর্মকর্তারা আর নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী হবেন না—যা শেষ পর্যন্ত ভোগাবে পুরো দেশকেই।
ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকের ঘটনা একটি ব্যক্তির নয়, এটি একটি পরীক্ষার নাম—এই রাষ্ট্র সত্যিকারের পেশাদারিত্বের পক্ষে দাঁড়াতে পারে কি না।
