০
মোহাম্মদ নাজিবুল বাশার। মধুপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা:
টাঙ্গাইলের মধুপুরে সূর্যমুখী চাষে ব্যতিক্রমী সাফল্য অর্জন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন
কৃষি স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন। তার হাতে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ সূর্যমুখী বাগন শুধু
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং মধুপুর অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
মধুপুর উপজেলার একটি এলাকায় চলতি মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেন ছানোয়ার
হোসেন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বীজ এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে অল্প খরচে অধিক ফলনের
সম্ভাবনা তৈরি করেছেন তিনি। তার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের
দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ছানোয়ার হোসেন জানান, ধান বা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে পানির প্রয়োজন
কম এবং সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও সীমিত। ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসে। সূর্যমুখী গাছ
তুলনামূলকভাবে খরা সহনশীল হওয়ায় মধুপুরের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে বেশ মানানসই। তিনি আরও বলেন,
সূর্যমুখী বীজ থেকে উৎপাদিত তেল স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা দিন দিন
বাড়ছে।
হলুদ রঙের সূর্যমুখী ফুলে ভরে উঠেছে তার ক্ষেত। প্রতিদিনই এলাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষক,
শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা মাঠ দেখতে ভিড় করছেন। অনেক কৃষক সরাসরি মাঠে এসে চাষ পদ্ধতি, সার
ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ছানোয়ার
হোসেন নিজ উদ্যোগে তাদের পরামর্শ দিচ্ছেন এবং সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ছানোয়ার হোসেনের এই সফলতা মধুপুর অঞ্চলে তেলজাত ফসল
উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণ করা
গেলে ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং কৃষকদের আয় বাড়বে।
ছানোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক ও উদ্ভাবনী কৃষি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। কৃষিতে বিশেষ
অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কৃষি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। তার মতে, কৃষিকে লাভজনক করতে হলে
নতুন নতুন ফসল চাষের দিকে মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
মহিষমারা ইউনিয়নের কৃষি পদক প্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, তিনি এ বছর ২বিঘা
জমিতে বারি-৩ জাতের সূর্যমুখী ফুল চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায়
সূর্যমুখী চাষে সময় কম লাগে। অল্প সময়ে ফসল পাওয়া যায়। লাভ অনেক বেশি। সরিষা ও সয়াবিন তেলের
চেয়ে সূর্যমুখী তেলে রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। প্রতিদিন দূর দূরান্তর থেকে অনেক ফুল প্রেমী ও
শিক্ষার্থীরা তার সূর্যমুখীর বাগান দেখতে আসে বলেও জানান তিনি।
মধুপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সূর্যমুখী ফুলে শতকরা ৯৯ ভাগ উপকারী ফ্যাট আছে,
যা মানবদেহের জন্য উপকারী। এতে রয়েছে ওমেগা-৬, ওমেগা-৯ , অলিক এসিড, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-
কে এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেল। সরিষা ও সয়াবিন এর চেয়ে সূর্যমুখী তৈল অসস্পৃক্ত
ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ কম থাকে।
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রকিব আল রানা জানান, চলতি মৌসুমে মধুপুরে পাহাড়ী
ইউনিয়ন গুলোতে বেশি সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিলো ১৮ হেক্টর এবছর উৎপাদন
হয়েছে ২৫ হেক্টর জমিতে যা গত বছরের চেয়ে ৬ হেক্টর বেশি । মধুপুর উপজেলার মোট ৪৮ হেক্টর জমিতে
সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। সূর্যমুখীর তেল অন্যান্য তেলের থেকে অনেক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। সূর্যমূখী
একটি লাভজনক, সুভাষীত ও অর্থকরী ফসল। এটি সবিস্তারে চাষাবাদ করতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে
অবদান রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মধুপুরে সূর্যমুখী চাষে তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে কৃষিতে
বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। কৃষক ছানোয়ার হোসেনের এই চমকপ্রদ উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক কৃষককে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী করে তুলবে বলে
সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
