মনসুর আলম, গোয়াইনঘাট (সিলেট) :
সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম আরিফুল হক চৌধুরী। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর পথচলার শুরু থেকেই নাগরিক সমস্যা নিরসন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ-এই তিনটি ভিত্তিকে সামনে রেখে তিনি নিজেকে জনবান্ধব নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানোর বাস্তব শিক্ষা দেয়, যা পরবর্তী সময়ে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। নিকটবর্তী সূত্র ও সমর্থকদের মতে, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই কেবল নগরকেন্দ্রিক ছিল না; বরং জেলা ও উপজেলার মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের আকাঙ্ক্ষাই তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রধান প্রেরণা।
এই বাস্তবতা থেকেই তিনি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া-এর নির্দেশনায় উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে শহরের সীমানা পেরিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
লোকালয়ের যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও গ্যাস সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও পেশাভিত্তিক সুযোগ সম্প্রসারণ-এই বিষয়গুলোই তাঁর রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে স্থান পায়।
প্রথমে তিনি সিলেট–১ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তে পরে তাঁকে সিলেট-৪ আসন-এ প্রার্থী করা হয়। দলীয় নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তকে তাঁর সমর্থকেরা ‘দলের চাহিদা ও জনমতের সমন্বয়’ হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন।
বিশেষ করে গোয়াইনঘাট উপজেলা, জৈন্তাপুর উপজেলা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা এলাকার মানুষ তাঁকে দীর্ঘদিনের সংগঠক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই চেনেন। তাঁর ভাষায়, এই অঞ্চলের মানুষের মৌলিক সমস্যা চিহ্নিত করেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। এর আগে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
ছাত্র রাজনীতি থেকেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, শহর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে সিলেট-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বিএনপির অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান-এর আস্থাভাজন হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ২০০৩ সালে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশন-এর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন এবং নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় সিলেটকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয় ও তদারকিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান-কে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সিটি মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্যে চারটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয় পেলেও একমাত্র সিলেটে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন আরিফুল হক চৌধুরী। তবে ২০২৩ সালে বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তিনি প্রার্থী হননি।
সিলেট-৪ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর বিপুল বিজয় ভোটারদের নতুন প্রত্যাশারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ভাবনা ও জনঘনিষ্ঠ রাজনীতিই এই বিজয়ের প্রধান ভিত্তি।
বিজয়ী প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মানুষ যে বিপুল সমর্থন দিয়ে আমাকে এমপি নির্বাচিত করেছেন, এর ঋণ শোধ করার মতো কোনো ক্ষমতা আমার নেই। তবে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি-সুখে-দুঃখে সিলেট–৪ আসনের মানুষের পাশে আজীবন থাকব। নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করাই হবে আমার একমাত্র লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, সিলেট-৪ আসনের অর্থনীতি প্রধানত পাথর কোয়ারিনির্ভর। দীর্ঘদিন ধরে জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও বিছনাকান্দি অঞ্চলের পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় লক্ষাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের কাছে স্থানীয় জনগণের প্রধান দাবি এখন একটাই-পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে কোয়ারি পুনরায় চালু করা এবং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
