গজারিয়া (মুন্সিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেশের ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্রুত মেরামত ও সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর স্মারক নং ৩১.০১.০০০০.০০০.৫০০.২০.০০১২.২০.১৮-এর মাধ্যমে ৪১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি জানিয়ে পত্র জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলায় ৩৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। প্রথম দফায় ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৯ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ২৩ লাখ ৬০ হাজার ১ টাকা ছাড় করা হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের ‘অন্যান্য ভবন ও স্থাপনা’ খাত থেকে এই অর্থ ব্যয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, গুয়াগাছিয়া ইউনিয়নের জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং হোসেন্দী ইউনিয়নের ইসমানির চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এগুলো ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। স্থানীয়দের প্রশ্ন—ভোটকেন্দ্র না হয়েও কীভাবে বরাদ্দ অনুমোদন পেল?
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরবলাকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাটি বলাকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টান বলাকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৭ নং বালুয়াকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আড়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৩ নং টেংগারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বৈদ্যারগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,, লক্ষীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পৈক্ষার পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য বাউশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোড়াচক বাউশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৬ নং মনাইরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩১ নং চাষিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হোগলাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৫ নং দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৯ নং কালিপুরা এন এস কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪২ নং কাজিপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৪ নং ফুলদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেফায়তুল্লা খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ও জামালদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে বরাদ্দ পাওয়ার পরেও কোন কোন বিদ্যালয় ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা ব্যয় করলেও পুরো অর্থ প্রধান শিক্ষক ও কমিটির পকেটে রয়ে গেছে। কোন কোন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বরাদ্দের এক টাকাও ব্যয় করেনি এমনটি জানা যায় বিদ্যালয়ের বিশেষ সূত্রে।
কোনো কোনো বিদ্যালয়ে মাত্র ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য মিললেও বাকি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এক টাকাও ব্যয় হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ সূত্র জানায়, ভুয়া বিল-ভাউচার দাখিল করে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে—সংস্কার কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকবেন বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং এলজিইডির প্রকৌশলীরা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার পরিদর্শনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রাক্কলন ও বিল ছাড়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশল অফিস ও হিসাব রক্ষণ অফিসে অর্থ না দিলে বিল প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়—এমন অভিযোগও করেছেন একাধিক শিক্ষক।
স্মারকে অর্থ ব্যয়ে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত কাজ সম্পন্ন এবং অডিটের জন্য বিল-ভাউচার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
তবে গোপন সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের দাবি তুলেছেন, অথচ দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই।
এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য সাংবাদিকদের ওপর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আ
ইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
