হাফিজুর রহমান:
বাজারে ১৭৩ টাকার তালা ৫ হাজার ৫৯০ টাকায় কেনাসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম কর্মকর্তা বেলাল হোসেন সরকার আবারও আলোচনায়। দুর্নীতি দমন কমিশন–দুদকের মামলার পর ওএসডি হওয়া এই কর্মকর্তার ওএসডি আদেশ বাতিল ও নতুন পদায়নের তোড়জোড় চলছে—যা রেল প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
দুদক মামলা ও ওএসডি আদেশ
গত বছরের ১৫ অক্টোবর বাজারদরের চেয়ে বহু গুণ বেশি দামে তালা, বালতি, বাঁশি, ঝাড়ুর মতো সামগ্রী কেনাসহ অনিয়মের অভিযোগে বেলালসহ ১৮ জন রেল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এরপর গত ১৫ মার্চ তাকে ওএসডি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ১৮ জুনের প্রজ্ঞাপনে বেলালের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে তাকে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক সুবিধা স্থগিত করা হয়। প্রজ্ঞাপনে উন্মুক্ত দরপত্র না করে নিয়ম ভেঙে সীমিত দরপত্রে পছন্দের প্রতিষ্ঠানে কাজ বণ্টন, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি গোপন রাখা ও বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে ক্রয়ের বিষয়গুলোকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ওএসডি বাতিলে নতুন তদবির
রেল প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, দুর্নীতির অভিযোগে处分ের পরও বেলাল হোসেন ওএসডি আদেশ বাতিলের জন্য ‘খাতির-তদবিরে’ সক্রিয় হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে—উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তিনি প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অতীতের সম্পর্ক ব্যবহার করে নতুন পদায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে রেল শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের এক নেতাকে বেলালের পক্ষে হুমকি দিতে শোনা যায়। সেখানে বলা হয়, “বেলালদের হাত অনেক লম্বা।” এ নিয়ে rেল প্রশাসনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ভয় দেখিয়ে এবং অতীতে দেওয়া ‘অনৈতিক সুবিধা’ প্রকাশের হুমকি দিয়ে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ও ‘ব্যবহার’
রেলপথ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি বেলাল নিজেকে ৯০–এর দশকের ‘বুয়েট ছাত্রদল কর্মী’ পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। তবে অতীতে তিনি বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে নানা সুবিধা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি আবার নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় হন বলেও শোনা যায়।
অভিযোগে নীরব বেলাল, সীমিত মন্তব্য রেল কর্মকর্তাদের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বেলাল হোসেন সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি; হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায়ও সাড়া দেননি।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন,
“দুদকের মামলার পর তাকে ওএসডি করা হয়েছে। ওএসডি বাতিলের জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে তাকে নতুন করে পদায়নের প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে—এমন কথা শোনা যাচ্ছে।”
এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
রেল প্রশাসনে চাপা ক্ষোভ
দুদকের মামলার পরও দুর্নীতির অভিযোগে চিহ্নিত কর্মকর্তার পুনর্বহালের তোড়জোড় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে রেল অধিদপ্তরের ভেতরে। কর্মকর্তারা বলছেন, কঠোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বদলে ক্ষমতার জোরে অনিয়মকারীদের পুনর্বাসন—রেলের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
