নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে অবৈধ মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের ধারাবাহিকতায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে মাদক পাচারের একটি চক্রকে শনাক্ত করে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। ডিএনসি দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক পাঠানো নিয়ে নজরদারি করে আসছিল। এরই অংশ হিসেবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ মার্চ ২০২৬ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক পার্সেল জব্দ করা হয়। পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকানো ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি বিদেশি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিক—LI BIN (৫৯), YANG CHUNSHENG (৬২) এবং YU ZHE (৩৬)—কে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানকালে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী মাদক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব থেকে ৬.৩০০ কেজি কিটামিন, সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহলসহ বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মোবাইল ফোন ও দেশি-বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত আলামত থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে চক্রটি সুসংগঠিতভাবে কিটামিন প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত।
গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা বিদেশ থেকে তরল কিটামিন সংগ্রহ করে উত্তরা এলাকায় ল্যাব স্থাপন করে পাউডার আকারে রূপান্তর করত। এরপর সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতর লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হতো।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। চক্রটি ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্ডার নিত এবং একই চ্যানেলের মাধ্যমে মাদক সংগ্রহ করত। তারা অর্থ লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করত—বিশেষ করে TRON নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ ইউএসডিটি পরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করে নিজেদের কার্যক্রম আড়ালে রাখত।
এছাড়া, আসামিদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময় অবস্থান করত এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করত। সন্দেহ করা হচ্ছে—চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত এবং বিভিন্ন দেশে তাদের আলাদা প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব থাকতে পারে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, চক্রটি এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, নিয়মিত ডেটা মুছে ফেলা, সিম ও মোবাইল পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখত। তবুও ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই চক্রের নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হচ্ছে ধাপে ধাপে।
মানবদেহে কিটামিনের ভয়াবহ প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা জানান, কিটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ। এটি সেবনে হ্যালুসিনেশন, দিশেহারা ভাব, শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও মূত্রথলির গুরুতর ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বাড়ে, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি।
ডিএনসি জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা প্রক্রিয়াধীন। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত আছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও আরও জোরদার করা
