স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এখন এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। দেশের সবচেয়ে বড় ডেটাবেজ, জাতীয় ডাটা সেন্টার, যেখানে রাখা আছে প্রতিটি নাগরিকের নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, আঙুলের ছাপ থেকে শুরু করে ভোটার আইডির সব তথ্য। অথচ এই ডাটা সেন্টারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি বিতর্কিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ-স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ নিয়ে আসা। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে ওঠা অনিয়ম-অভিযোগ, প্রশ্ন তুলেছে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকদের এত বড় ডাটাবেজ কোনোভাবে অরক্ষিত হলে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই নয়, জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের ১০ তলায় অবস্থিত জাতীয় ডাটা সেন্টার। এখানেই রাখা আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাগরিক তথ্যভান্ডার। আগস্টের পর নতুন করে এই ডাটা সেন্টারের রক্ষণা বেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএমআইটি নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু টেন্ডারের প্রক্রিয়াই তুলে ধরছে ভিন্ন গল্প। টেন্ডারে অংশ নেওয়া ছয় নাম্বারে অবস্থানকারী প্রতিষ্ঠান ছিল বিএমআইটি। অথচ প্রথম পাঁচ দরদাতাকে বাদ দিয়ে কাজ দেওয়া হয়েছে তাদের হাতে। অভিযোগ আছে, টেন্ডারে অংশ নেওয়া প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয় ‘টেকনিক্যাল ডেভিয়েশন’ দেখিয়ে। অথচ ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো অভিযোগই ধরা হয়নি। প্রতিযোগী ভেন্ডররা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও কমিশনের ভেতরের একটি সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। ফলে নিয়ম মেনে কাজ করতে আসা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইসির ভেতরে কাজ করা সিন্ডিকেটের কথা খোলাখুলিভাবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, একজন যুগ্ম সচিব (এপিডি) নুরুজ্জামান খানের সঙ্গে বিএমআইটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে বিটিসিএলে একসঙ্গে কাজ করার সূত্রে এই সম্পর্ক এখন ব্যবসায়িক সুবিধা তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ। এই সিন্ডিকেটের কারণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়মিত অনিয়ম ঘটছে। কোনো টেন্ডারে বিএমআইটি যদি সর্বনিম্ন দরদাতা না-ও হয়, তবু অন্যদের বাদ দিয়ে কাজ চলে যাচ্ছে তাদের হাতে। না হলে টেন্ডার পুনরায় ডাকা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার একটি টেন্ডার ডাকা হয়েছিল ভোটার নিবন্ধন কিটস কেনার জন্য। এখানে বিএমআইটি সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও তাদের স্যাম্পল সরবরাহের ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়ে, টেকনিক্যালি তারা ছিল নন-রেসপন্সিভ। কিন্তু অন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে পুরো টেন্ডারই বাতিল করে দেওয়া হয়। এর আগে গত সরকারের সময়ও এমন ঘটনা ঘটেছে। একাধিকবার দেখা গেছে, বিএমআইটি টেন্ডারে তিন, চার কিংবা পাঁচ নম্বরে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে কাজ তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই যোগ্য প্রতিযোগীদের টেকনিক্যাল অজুহাতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরণের প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাকে বিকৃত করছে না, বরং জাতীয় ডাটা সেন্টারকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দেশের ১৩ কোটি নাগরিকের তথ্য যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হয় বা বিদেশে পাচার হয়, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হতে পারে। তথ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, একবার যদি এত বড় ডাটাবেজের নিয়ন্ত্রণ ভুল হাতে যায়, তখন আর সেটা শুধু ভোটার তালিকা থাকে না, বরং নাগরিক পরিচয়, আর্থিক লেনদেন, এমনকি ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রতিটি খুঁটিনাটি বিপন্ন হয়ে পড়ে।
অতীতে বাংলাদেশে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছিল। তখন অনেককে শাস্তির মুখোমুখি হতে হলেও নীতিগত দুর্বলতা থেকে যায়। ফলে এখনো এই খাত দুর্বল, অরক্ষিত ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই। ডাটা সেন্টারে রাখা তথ্য যদি চুরি হয় বা বাইরে চলে যায়, তখন নাগরিকরা আর্থিক প্রতারণা, জালিয়াতি বা পরিচয় চুরির শিকার হতে পারেন।
একজন প্রতিযোগী ভেন্ডরের ভাষায়, আমরা যারা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই ব্যবসা করতে চাই, তারা বারবার লুজার হচ্ছি। অথচ দেশের সবচেয়ে বড় ডাটাবেজ সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা নষ্ট করছে না, দেশের ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। জাতীয় ডাটা সেন্টার ও ১৩ কোটি নাগরিকের তথ্য রক্ষার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কারণ, যত দেরি হবে, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ততই বাড়বে। আর কোনো দিন যদি নাগরিক তথ্য ভাণ্ডার ফাঁস হয়ে যায় বা নষ্ট হয়, তখন দেশের জনগণই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে।
