অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | বিশেষ প্রতিনিধি:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদায়ন ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে—স্বৈরাচারী শাসনামলে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন বিতর্কিত প্রকৌশলীকে আবারও ঢাকার কেন্দ্রীয় ও ভিআইপি স্থাপনার দায়িত্বে বসানো হচ্ছে। এতে প্রশাসনের ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ ও উদ্বেগ। অনেক কর্মকর্তা এটিকে ‘প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী’ বলছেন।
ভিআইপি স্থাপনার দায়িত্বে বিতর্কিত বদলি
সাম্প্রতিক সময়ে ইডেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তারকে বদলি করে ঢাকা গণপূর্ত ডিভিশন-২–এ পদায়ন করা হয়। এই ডিভিশনের আওতায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, গণভবনসহ রাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি ক্ষমতাসীনদের আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরের একটি অংশ মনে করছে, এমন সংবেদনশীল স্থাপনায় বিতর্কিত কর্মকর্তার পদায়ন প্রশাসনিক নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।
সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ বছরে মো. আব্দুস সাত্তার এবং তার নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখলে অস্বাভাবিক লেনদেনের চিত্র উঠে আসতে পারে। তাদের মতে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে ঘোষিত সম্পদের বাস্তব চিত্র মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিটি ও দুদকের অনুসন্ধান
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা গণপূর্ত ডিভিশন-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)ও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এপিপি ও থোক বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইডেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) ও থোক বরাদ্দের বড় অংশে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পে কাজের তুলনায় ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তা।
সচিবালয় সংস্কারের নামে অর্থ লোপাট?
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ সচিবালয়ের সাম্প্রতিক সংস্কারকাজ ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে আটটি ভবন সংস্কারের নামে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়। তবে বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কাজ না করেই কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ দেখিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। সংস্কার শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরালো হয়েছে।
ফাটল ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
সচিবালয়ের যেসব ভবনে সম্প্রতি সংস্কারকাজ করা হয়েছে, সেখানে ফাটল দেখা দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকৌশলীরা বলছেন, নিম্নমানের কাজ ও অনিয়মের ফলেই এ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্বচ্ছতার দাবি
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার মনে করছেন, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি রক্ষা সম্ভব নয়। তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
এখন দেখার বিষয়—গঠিত তদন্ত কমিটি ও দুদকের অনুসন্ধান কতটা স্বাধীন ও কার্যকরভাবে সত্য তুলে আনতে পারে।
এরপর থাকছে তার জমি ও ফ্লাট এর তথ্য চলবে….
