হাফিজুর রহমান:
টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলা ও ভূঞাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-২ জাতীয় সংসদীয় আসনটি বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই জনপদে জন্ম নিয়েছেন ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা একাধিক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব।
হাতেম আলী তালুকদার: গণমানুষের নেতা
হাতেম আলী তালুকদার বা হাতেম তালুকদার (১১ জানুয়ারি ১৯২৭ – ২৪ অক্টোবর ১৯৯৭) ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও টাঙ্গাইল-২ আসনের প্রাক্তন সংসদ সদস্য।
তিনি ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলনসহ তৎকালীন সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে টাঙ্গাইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জনসম্পৃক্ত রাজনীতির জন্য তিনি এলাকায় আজও স্মরণীয়।
খন্দকার আসাদুজ্জামান: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও রাষ্ট্রনায়ক
খন্দকার আসাদুজ্জামান (২২ অক্টোবর ১৯৩৫ – ২৫ এপ্রিল ২০২০) ছিলেন টাঙ্গাইল জেলার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।
স্বাধীনতার আগে তিনি রাজশাহীর জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের অর্থবিভাগের যুগ্মসচিব নিযুক্ত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুজিবনগর সরকারের অর্থ সচিব ছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এবং বঙ্গবন্ধু শিশুকিশোর পরিষদের সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শহীদুল ইসলাম লালু: সর্বকনিষ্ঠ বীর প্রতীক
শহীদুল ইসলাম লালু (মৃত্যু: ২৫ মে ২০০৯) ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের এক সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধে অংশ নেন।
১৯৭১ সালের ৭ অক্টোবর গভীর রাতে গোপালপুর থানায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে তাঁর সাহসিকতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য। ছদ্মবেশে শত্রু ঘাঁটিতে প্রবেশ করে গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীকে ভীতসন্ত্রস্ত করেন। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ‘বীরবিচ্ছু’ উপাধিতে ভূষিত এই বীর সন্তান গোপালপুর উপজেলার সূতীপলাশ পাড়া গ্রামের গর্ব।
গোপালপুর উপজেলা: ইতিহাস ও ভূগোল
গোপালপুর উপজেলা ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলার উত্তরে অবস্থিত। উত্তরে ধনবাড়ী ও মধুপুর, পূর্বে মধুপুর ও ঘাটাইল, দক্ষিণে ঘাটাইল ও ভূঞাপুর এবং পশ্চিমে যমুনা নদী ও জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলা। ঝিনাই ও বৈরাণ নদী এ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত।
১৯২০ সালে গোপালপুর থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় গোপালপুর পৌরসভা। ঢাকার মহাখালী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার।
ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও শিক্ষা
গোপালপুর একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। ধান, পাট, গম, আলু ও শাকসবজি এখানকার প্রধান ফসল। একসময় পাট ব্যবসায় এই অঞ্চল বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে কৃষির পাশাপাশি মৎস্য, পোলট্রি, গবাদিপশু পালন ও ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে গোপালপুর সরকারি কলেজ, হেমনগর শশীমুখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বহু ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা এই অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দর্শনীয় স্থান
গোপালপুর উপজেলার পাথালিয়া গ্রামে অবস্থিত ২০১ গম্বুজ মসজিদ বিশ্বের সর্বাধিক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোর একটি। এছাড়া হেমনগর জমিদার বাড়ি এ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অন্যতম নিদর্শন।
