মনসুর আলম, গোয়াইনঘাট:
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাথর কোয়ারি, বেকার হয়ে পড়া লক্ষাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান, গ্যাসক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও ঘরে ঘরে গ্যাস-বঞ্চনা এবং পর্যটন সম্ভাবনায় ভরা জাফলং-ভোলাগঞ্জ রক্ষার প্রশ্ন-এই চারটি ইস্যুই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনকে পরিণত করেছে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও অর্থনীতিনির্ভর ভোটযুদ্ধে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় স্পষ্ট প্রায় তিন লাখ পাথর, বালু ও সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী পরিবারের ভোটই এ আসনের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় নিয়ামকে পরিণত হতে যাচ্ছে।
সিলেট-৪ আসন (নং–২৩২) এ বিএনপি-জমিয়ত মনোনীত যোগ্য প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সিটি করপোরেশনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের রূপকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি যেমন রয়েছে, তেমনি বঞ্চনা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়েছে।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎকালেই মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম চূড়ান্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে দলীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
মনোনয়ন বঞ্চিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা হেলাল আহমেদের প্রকাশ্য সক্রিয়তা আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী মাঠকে নতুন গতি দিয়েছে। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এবারের নির্বাচনে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছেন বলে মাঠপর্যায়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নির্বাচনের শেষ সময়ে এসে তিনি শহরকেন্দ্রিক প্রচারণা কমিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম ও হাওর-বাঁওড় অধ্যুষিত নিম্নাঞ্চলে সরাসরি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরছেন তিনি।
নির্বাচনী ইশতেহারে আরিফুল হক চৌধুরী তুলে ধরেছেন-তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়ন, বন্ধ পাথর কোয়ারিতে পরিবেশসম্মত ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে উত্তোলন চালু, বেকার শ্রমিকদের পুনরায় কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র উন্নয়ন, স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরকে পৌরসভায় রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে প্রতিবেদকের ধারণা, পাথর ও বালু খাতসংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণির একটি বড় অংশের ভোট ধানের শীষের বাক্সেই পড়তে পারে। স্থানীয় পাথর শ্রমিক আল-আমীন বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোয়ারি সচল করে কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দিতে যিনি সক্ষম হবেন, ভোটাররা তাকেই বেছে নেবেন।
অন্যদিকে, ইনসাফভিত্তিক উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী, সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও সাবেক দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। জন্মভূমি এই নির্বাচনী এলাকায় হওয়ায় এবং পার্শ্ববর্তী দুই উপজেলায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর একটি সুদৃঢ় পরিচিতি রয়েছে।
মো. জয়নাল আবেদীনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে বেকার পাথর শ্রমিকদের পুনরায় কর্মসংস্থান, জন্মভূমিতে অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্রের সুবিধা নিয়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগ, জাফলং-ভোলাগঞ্জ পরিবেশ ও পর্যটন এলাকা সংরক্ষণ, চা শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা অবকাঠামো জোরদার, যুব কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, আলেম-ওলামা সমাজের একটি বড় অংশের ভোট দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দিকে যেতে পারে। কৌশলগত কারণে তাঁর প্রচারণা অনেকটাই নীরব সাংগঠনিক তৎপরতার মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম (ট্রাক), জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (লাঙ্গল) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা জাহিদ আহমেদ (হাতপাখা) প্রতীক নিয়ে মাঠে থাকলেও আলোচনায় দৃশ্যমান প্রভাব লক্ষ করা যায়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-৪ আসনে মোট ভোটার ৫,১২,৯৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,৬৭,১৩০ জন, নারী ভোটার ২,৪৫,৮০২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। মোট ১৭২টি ভোটকেন্দ্রের ১,০০৮টি ভোটকক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
মাঠপর্যায়ের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা বলছে, প্রায় তিন লাখ ভোটার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাফলং, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, শ্রীপুর ও সারী নদীকেন্দ্রিক বালুমহাল, পাথর কোয়ারি, তামাবিল স্থলবন্দরভিত্তিক পাথর আমদানি ও পাথর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত পরিবারভুক্ত।
নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা যায়, এ আসনে বিএনপি তিনবার, স্বতন্ত্র প্রার্থী দুইবার এবং আওয়ামী লীগ সাতবার নির্বাচিত হয়েছে। তিন উপজেলা ঘুরে অনুসন্ধানে ইঙ্গিত মিলেছে-কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশের ভোট ধানের শীষ প্রতীকের বাক্সে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, অতীতে এই অঞ্চলের পাথর কোয়ারিতে আধিপত্য বিস্তার, দখল ও পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের একাংশ নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। একই সঙ্গে বিএনপির কিছু সুবিধাভোগী নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও হামলা ও মামলার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে আবারও দখল ও ক্ষমতার দাপট ফিরে আসবে কি না-এই শঙ্কাও নির্দলীয় ভোটারদের মধ্যে স্পষ্টভাবে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সিলেট-৪ আসনের এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়; এটি মূলত পাথর-বালু, গ্যাস ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত লক্ষাধিক শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ জীবিকার প্রশ্নে একটি নির্ণায়ক রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। এই বিশাল শ্রমজীবী ভোটার গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে-সিলেট–৪ আসনের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে।
ছবি ক্যাপশনঃ ১/ বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। ২/ জামাতি ইসলামের প্রার্থী মো.জয়নাল আবেদীন।
