মোঃ আবদুল মান্নান
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক রাজনীতির অগ্নিগর্ভ অঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত, বিশেষ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা—এই অঞ্চলকে নতুন করে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে: এই যুদ্ধ কি নিরাপত্তার প্রয়োজনে, নাকি রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশল? “আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা এর অবসান চাই”—এই আহ্বান কেবল মানবিক আবেদন নয়; এটি আজকের বাস্তবতার কঠোর বিশ্লেষণ থেকে উঠে আসা একটি অবস্থান। ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হওয়ায় তিনি সংঘাতকে একটি “রাজনৈতিক ঢাল” হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই ধারণা নতুন নয়—ইতিহাসে বহু নেতাই অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতে বহিরাগত সংঘাতকে ব্যবহার করেছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং জনসমর্থনের ওঠানামা—এসবই তাঁর জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ একটি “একত্রীকরণ কৌশল” হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যা একপাক্ষিকও হতে পারে। ইসরায়েল বহু বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। ফলে প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধ কি কৌশলগত প্রতিরোধ, নাকি অতিরঞ্জিত হুমকির প্রতিক্রিয়া? যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু এই মিত্রতা কতটা নীতিগত, আর কতটা রাজনৈতিক—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জে ডি ভ্যান্স-এর মতো নেতাদের সম্পৃক্ততা এবং আলোচনার মাঝপথে হঠাৎ পরিবর্তন—এসব ঘটনাকে কেউ কেউ কূটনৈতিক প্রভাব খাটানোর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যস্থতাকারী, নাকি এক পক্ষের কৌশলগত অংশীদার? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে শান্তি আলোচনার অংশ এবং সামরিক জোটেরও অংশীদার। যুদ্ধবিরতি প্রায়শই স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করার বদলে একটি “কৌশলগত বিরতি” হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি—যা ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হয়েছে—তা আসলে কতটা কার্যকর? সমালোচকদের মতে, যদি সংঘাতের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থাকে, তাহলে যুদ্ধবিরতি কেবল পরবর্তী সংঘর্ষের প্রস্তুতির সময় দেয়। নেতানিয়াহুর আপত্তি এই জায়গাতেই—তিনি হয়তো মনে করেন, এই বিরতি ইরানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা দেখাচ্ছে, এই সংঘাত আর দ্বিপাক্ষিক নেই। এটি বহুমাত্রিক এবং আঞ্চলিক। ইরানের অভিযোগ—এই হামলা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। ইসরায়েলের দাবি—লেবানন চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। এই দ্বৈত অবস্থানই প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাস্তব রাজনীতির মধ্যে একটি বড় ফাঁক রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে—এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা, খাদ্য সরবরাহে ব্যাঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ধাক্কা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে সংঘাত মানেই বৈশ্বিক বাজারে ধাক্কা। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। বেসামরিক মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি, মানসিক ট্রমা—এসব কোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। ইতিহাস দেখিয়েছে—যুদ্ধ শেষ হলেও এর সামাজিক ক্ষত বহু বছর ধরে থেকে যায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না—সব যুদ্ধ কি অপ্রয়োজনীয়? কিছু ক্ষেত্রে, যেমন আত্মরক্ষা বা গণহত্যা প্রতিরোধ—যুদ্ধকে “ন্যায্য” বলা হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে এটিকে “Just War Theory” বলা হয়। তাই “আমরা যুদ্ধ চাই না”—এই অবস্থান গ্রহণযোগ্য হলেও, বাস্তবতা কখনো কখনো জটিল। এই সংঘাত শুধু ইসরায়েল বনাম ইরান নয়। এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর শক্তির প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, সামরিক জোট ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। এই কারণেই একটি আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। যুদ্ধের সময় তথ্যও একটি অস্ত্র হয়ে ওঠে। প্রতিটি পক্ষ নিজেদের বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফলে “ভুয়া অভিযোগ” বা “প্রচার” নিয়ে যে বিতর্ক—তা পুরোপুরি অমূলক নয়। “আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা এর অবসান চাই”—এই বক্তব্যটি তিনটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ: যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে। এটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করে। মানবিক ক্ষতি কোনোভাবেই ন্যায্যতা পায় না। যুদ্ধ কখনোই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে—অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও। তবে একটি বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে—শুধু “যুদ্ধ চাই না” বললেই যুদ্ধ থামে না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর কূটনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং বাস্তবসম্মত সমাধান। অতএব, এই আহ্বানটি কেবল আবেগ নয়—এটি একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব, একটি অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা এবং একটি মানবিক দাবি।
