মোঃ আবদুল মান্নান
নবীনগরের ঘটনাটি আর কোনোভাবেই “একটি বিচ্ছিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা” বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর প্রকাশ্য চপেটাঘাত, প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি নির্মম অবমাননা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষাক্ত পরিণতির এক নগ্ন উদাহরণ। একজন উপসহকারী প্রকৌশলী—রাষ্ট্রের মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধি—যখন দিনের আলোয়, মানুষের সামনে, একটি বাঁশ হাতে তেড়ে আসা ঠিকাদারের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে বাধ্য হন, তখন প্রশ্নটি আর ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়; এটি রাষ্ট্র বনাম দখলদার শক্তির সংঘর্ষ। নবীনগর আজ কেবল একটি উপজেলা নয়; এটি যেন একটি প্রতীক—যেখানে আইনের শাসনকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করা হয়েছে। এই দৃশ্য শুধু লজ্জাজনক নয়, এটি বিপজ্জনক। কারণ, এটি একটি বার্তা ছড়িয়ে দেয়—“রাষ্ট্র দুর্বল, প্রভাবশালীরা শক্তিশালী।” এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর স্বাভাবিকীকরণ। আমরা এমন এক সমাজে পৌঁছে গেছি, যেখানে একজন ঠিকাদার কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে জবাব দেয় যুক্তি দিয়ে নয়, বাঁশ দিয়ে। এবং সে জানে—তার পেছনে এমন শক্তি আছে, যা তাকে রক্ষা করবে। এই আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে আসে? এটি কি কেবল ব্যক্তিগত দম্ভ, নাকি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল? অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠ। যদি সেটি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের চূড়ান্ত রূপ। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প—যেখানে জনগণের করের টাকা ব্যয় হয়—সেগুলো যদি এমন ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত হয়, যারা জবাবদিহিতার বদলে দাপট দেখায়, তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে কাদের জন্য? এখানে প্রশ্ন তুলতেই হয়—কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়, অথচ তার বিরুদ্ধে নিম্নমান, ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে? এই দায় কি শুধু একজন ঠিকাদারের, নাকি পুরো ব্যবস্থার? এই ব্যবস্থাটি আসলে একটি অদৃশ্য জোট—ঠিকাদার, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার ত্রিভুজ। এই ত্রিভুজের ভেতরে আটকা পড়ে যায় সাধারণ মানুষ, আর সৎ কর্মকর্তারা হয়ে ওঠেন সবচেয়ে অসহায়। যে প্রকৌশলী কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি আসলে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই সততা তাকে রক্ষা করেনি; বরং তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে সততা একটি ঝুঁকি, আর অনিয়ম একটি নিরাপদ পথ। এখন প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কোথায়? প্রশাসন কোথায়? একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিবৃতি দেওয়া, “কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে”—এই পুরোনো বাক্যগুলো কি আর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে? মানুষ এখন ফলাফল দেখতে চায়। তারা দেখতে চায়—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি কেবল দুর্বলদের জন্য? এই ঘটনার পর যদি দ্রুত, দৃশ্যমান এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তাহলে এটি একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। তখন প্রতিটি সৎ কর্মকর্তা মনে করবেন—“আমি কেন ঝুঁকি নেব?” এবং প্রতিটি দুর্বৃত্ত মনে করবে—“আমার কিছুই হবে না।” এই মানসিকতা একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। আরও উদ্বেগজনক হলো সামাজিক প্রতিক্রিয়া। ঘটনাটি জনসম্মুখে ঘটেছে, মানুষ দেখেছে, ভিডিও করেছে, শেয়ার করেছে। কিন্তু প্রতিরোধ কোথায়? আমরা কি কেবল দর্শক হয়ে গেছি? অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস কি আমাদের সমাজ হারিয়ে ফেলেছে? এই নীরবতা আসলে অপরাধকে শক্তিশালী করে। যখন সমাজ চুপ থাকে, তখন দুর্বৃত্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি সত্যিই কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এই ঘটনার পেছনে থাকে, তাহলে সেই মহলকে প্রকাশ্যে জবাব দিতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা মানে দায়বদ্ধতা—দাপট নয়। সরকারের জন্য এটি একটি পরীক্ষা। তারা কি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাস করে, নাকি কেবল মুখে বলে? তারা কি একজন প্রভাবশালী ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে, নাকি নীরব সমঝোতায় বিষয়টি ধামাচাপা দেবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা কোন পথে যাচ্ছি। উন্নয়ন শব্দটি আজ সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি। সড়ক হচ্ছে, সেতু হচ্ছে, ভবন হচ্ছে—কিন্তু সেই উন্নয়নের ভেতরে যদি থাকে দুর্নীতি, ভয়ভীতি ও সহিংসতা, তাহলে সেটি আসলে উন্নয়ন নয়; এটি একটি ছদ্মবেশ। নবীনগরের এই ঘটনা সেই ছদ্মবেশ ছিঁড়ে দিয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে—উন্নয়নের আড়ালে কী ভয়ংকর বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। এখন প্রয়োজন কঠোর সিদ্ধান্ত। শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার। ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কাজের মানের কঠোর তদারকি, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন—এই তিনটি ছাড়া কোনো সমাধান সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা, একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। কারণ, আজ যদি একজন প্রকৌশলীকে ধাওয়া করা যায়, কাল একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে, পরশু একজন বিচারককে—এভাবে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভ ভেঙে পড়বে। নবীনগরের এই ঘটনা তাই একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে, যেখানে আমরা আমাদের রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা দেখতে পাচ্ছি—একটি চেহারা, যা লজ্জাজনক, উদ্বেগজনক এবং বিপজ্জনক। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই চেহারা মেনে নেব, নাকি পরিবর্তনের সাহস দেখাব? কারণ, নীরবতা এখন আর নিরপেক্ষতা নয়; এটি অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সমান।
