[location_search]
সম্পূর্ণ নিউজ ভোরের বাংলাদেশ

স্বাস্থ্য
৪:৫২ অপরাহ্ণ, ৭ মে ২০২৬

শনিবারের সেই কালো মেঘ,বাবার শেষ বিদায়, বড় ভাইয়ের পঙ্গুত্বের দীর্ঘশ্বাস।

http://স্মৃতিগুলো যখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে, বুকটা তখনো হু হু করে ওঠে। দিনটা ছিল ২০১৯ সালের এক সাধারণ শনিবার। সকালের সেই চিরচেনা দৃশ্য—মায়ের হাতের রান্না দিয়ে আমি আর বড় ভাই একসাথে তৃপ্তি করে খেয়ে যার যার কর্মস্থলের দিকে পা বাড়ালাম। কে জানত, সেই সকালের বিদায়বেলাটাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে? ​২০১৯ সালের সেই শনিবারের সকালটা আর […]

শনিবারের সেই কালো মেঘ,বাবার শেষ বিদায়, বড় ভাইয়ের পঙ্গুত্বের দীর্ঘশ্বাস।
মোঃ সাব্বির হোসেন
১৬ মিনিটে পড়ুন |
  1. http://স্মৃতিগুলো যখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে, বুকটা তখনো হু হু করে ওঠে। দিনটা ছিল ২০১৯ সালের এক সাধারণ শনিবার। সকালের সেই চিরচেনা দৃশ্য—মায়ের হাতের রান্না দিয়ে আমি আর বড় ভাই একসাথে তৃপ্তি করে খেয়ে যার যার কর্মস্থলের দিকে পা বাড়ালাম। কে জানত, সেই সকালের বিদায়বেলাটাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে? ​২০১৯ সালের সেই শনিবারের সকালটা আর দশটা দিনের মতোই উজ্জ্বল ছিল। মা পরম মমতায় আমাদের দু-ভাইকে খাইয়ে দিলেন। আমি আর বড় ভাই হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বের হলাম যে যার গন্তব্যে। কিন্তু আকাশটা হঠাৎ ই কালো হয়ে এলো, শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। প্রকৃতির সেই কান্নায় যেন কোনো এক অশুভ সংকেত লুকিয়ে ছিল। ​হঠাৎ ফোনের ওপার থেকে আসা একটি খবর আমার পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে দিল—”ভাইয়ের এক্সিডেন্ট হয়েছে!” ​বৃষ্টির সেই তোড়ের মধ্যে আমি আর বড় আপা পাগলের মতো ছুটে গেলাম আমাদের পাশের থানা ধনবাড়িতে। চারদিকে বৃষ্টির শব্দ, কিন্তু আমার কানে তখন কেবল ভাইয়ের জন্য হাহাকার। হাসপাতালে পৌঁছে যা দেখলাম, তা সহ্য করার শক্তি কোনো ভাইয়ের থাকে না। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে আমার বড় ভাই। তার একটি পা চুরমার হয়ে গেছে, সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। ​আমাদের লড়াইটা সেখান থেকেই শুরু হলো। ভাইকে নিয়ে আমরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটলাম, কিন্তু কেউ তাকে ভর্তি নিতে চাইল না। ভাইয়ের আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে সবাই ফিরিয়ে দিচ্ছিল। এমনকি ময়মনসিংহ হাসপাতাল থেকেও যখন আমাদের নিরাশ করা হলো, তখন মনে হচ্ছিল চারদিকের পৃথিবীটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। ​অবশেষে বড় ভাইকে নিয়ে আমরা ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের দিকে রওনা হলাম। একটি অ্যাম্বুলেন্স, ভেতরে ভাইয়ের নিথরপ্রায় দেহ, মাথার পাশে ঠায় বসে আছি আমি। সাথে বোন আর বোন জামাই। সবার চোখে জল, মনে এক রাশ আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। ​বাইরে তখনো ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দের সাথে আমার মনের কান্নার কোনো পার্থক্য ছিল না। আমি ভাইয়ের রক্তাক্ত পা আর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—সকালেই তো আমরা একসাথে খেলাম! জীবনের চাকা এত দ্রুত কীভাবে বদলে যায়? অ্যাম্বুলেন্সের সেই রুদ্ধশ্বাস যাত্রা শেষ হলো ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের গেটে এসে। কিন্তু যন্ত্রণা আর উৎকণ্ঠার যে নতুন এক অধ্যায় সেখানে অপেক্ষা করছিল, তা হয়তো আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। ​অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনটা যখন পঙ্গু হাসপাতালের সামনে এসে থামল, তখন চারদিকে কেবল মানুষের ভিড় আর আর্তনাদ। চারদিকের বাতাস যেন রুগীদের হাহাকারে ভারি হয়ে আছে। স্ট্রেচারে করে ভাইকে নামানোর সময় চারদিকে তাকিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লাম। তিল ধারণের জায়গা নেই, এক বুক হাহাকার নিয়ে মানুষ ছুটছে একটু চিকিৎসার আশায়। হাসপাতালের সেই পরিবেশে আমাদের ভাইকে ভর্তি করানোই তখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।​অপেক্ষার প্রহর ও নিয়তি ​সময় যেন কাটতেই চায় না। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, আমাদের উদ্বেগ তত বাড়ছে। অবশেষে দীর্ঘ লড়াই আর আকুতির পর রাত যখন ১২টা, তখন বড় ভাইকে ভর্তি করানোর সুযোগ হলো। কিন্তু লড়াইটা তো সেখানেই শেষ ছিল না, বরং আসল পরীক্ষা শুরু হলো তখন। ​চিকিৎসকরা জানালেন, দ্রুত অপারেশন করতে হবে, আর তার জন্য প্রয়োজন রক্ত। সেই মুহূর্তে নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি অনুভব করলাম। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে যখন ভাইকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন আমার শরীর থেকে রক্ত নেওয়া শুরু হলো। ​আমার শিরার রক্ত যখন নল দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন কেবল মনে হচ্ছিল—এই রক্ত তো আমাদের একই ধমনীর। আজ আমার রক্ত দিয়ে যদি ভাইয়ের জীবনের নতুন স্পন্দন ফিরে আসে, তবেই আমার জন্ম সার্থক। ​অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা জ্বলছে, আর বাইরে আমি আর আমার পরিবার দোয়াদরুদ পড়ে কাটিয়ে দিচ্ছি প্রতিটি সেকেন্ড। আমার শরীর থেকে দেওয়া রক্তে যখন ভাইয়ের অপারেশনের শুরুটা হলো, তখন মনের এক কোণে অদ্ভুত এক শান্তি আর অন্য কোণে পাহাড়সম ভয় কাজ করছিল। এভাবে অনিশ্চয়তা আর ত্যাগের মধ্য দিয়ে কেটে গেল জীবনের দীর্ঘতম এক রাত। ​ভোরের আলো যখন ফুটল, তখন আমরা বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, কিন্তু মনের ভেতর একটাই প্রার্থনা ছিল—”হে ঈশ্বর, আমার ভাইকে আবার সুস্থভাবে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও।” ​সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত আজও আমার রক্তে শিহরণ জাগায়। হাসপাতালের সেই হাহাকার আর নিজের রক্ত দেওয়ার সেই অনুভূতি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, পৃথিবীর সব সম্পর্কের চেয়ে ভাই-ভাইয়ের টান অনেক বড়। রাতের বুক চিরে যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন ঢাকা শহরটা আমাদের কাছে পরিচিত কোনো শহর নয়, বরং এক গোলকধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল। মানুষের আনাগোনা বাড়ছে, শহরটা জাগছে, কিন্তু আমাদের পৃথিবীটা থমকে গেছে সরকারি পঙ্গু হাসপাতালের ঐ দেয়ালগুলোর মাঝে। ডাক্তাররা আসবে কি আসবে না—এই দোলাচলের মাঝেই ভাইকে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে বেডে দিয়ে গেল। ​পায়ের সেই ব্যান্ডেজ আর সাদা তুলার স্তূপের নিচে আমার চঞ্চল ভাইটা কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। মাত্র এক রাতেই তার চেনা চেহারাটা কেমন অচেনা হয়ে গেছে। যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া সেই মুখটার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। ​বোন জামাইটা নিজের দায়িত্ব পালনের আপ্রাণ চেষ্টা করছিলো। ডাক্তাররা চিরকুটে একের পর এক ওষুধের নাম লিখছেন, আমি এবং বোন জামাই সেই অচেনা শহরের অলিগলিতে ওষুধের খোঁজে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছি। বড় বোনটা সারাক্ষণ ভাইয়ের শিয়রে বসে চোখের জল ফেলছে—সেই কান্নার কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশব্দ হাহাকার। মেঝ ভাইও গ্রাম থেকে এসে পৌঁছালো, কিন্তু কারো মনে শান্তি নেই, পেটে ক্ষুধা নেই, চোখে ঘুম নেই। ​রাস্তার ধারের হোটেলের খাবারগুলো মুখে তুললে মনে হতো বিষ খাচ্ছি। পানির কোনো স্বাদ নেই, বাতাসের কোনো ঘ্রাণ নেই। চারিদিকে শুধু হাহাকার। এর মধ্যেই যখন ডাক্তার বললেন আরও রক্ত লাগবে, তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মাথায়। অচেনা মানুষের ভিড়ে রক্ত চেয়ে চেয়ে ঘুরেছি। এভাবে এক দুই ব্যাগ নয়, ১৫ ব্যাগ রক্ত আর দীর্ঘ ১২ দিনের লড়াইয়ে ১২ বার অপারেশন থিয়েটারের দরজায় ভাইকে পৌঁছে দিয়েছি। ​অপারেশন হয়, রক্ত দেওয়া হয়, কিন্তু ক্ষত সারে না। উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই, বরং ভাইয়ের পা-টা ক্রমে কালো হয়ে আসছিল। ইনফেকশন যখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম, তখন ডাক্তাররা বোর্ড বসালেন। পঙ্গু হাসপাতালের সেই শেষ অপারেশনটার পর ভাইয়ের যে অবস্থা দেখলাম, তাতে কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। ​মনে হচ্ছিল, আমরা এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। ডাক্তাররা যখন ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে রেফার করার কথা বললেন, তখন আর এক মুহূর্ত দেরি করার সাহস ছিল না। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দের চেয়েও তীব্র ছিল ভাইয়ের আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ নিয়ে, এক বুক হাহাকার আর অনিশ্চয়তা সঙ্গী করে আমরা আবার অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। ​”মানুষের জীবন কত সস্তা আর প্রিয়জনের কষ্ট কত ভারী, সেটা পঙ্গু হাসপাতালের ঐ ১২ দিন আমাদের হাড়েমজ্জায় বুঝিয়ে দিয়েছে।” পঙ্গু হাসপাতালের সেই গুমোট বাতাস আর বিভীষিকাময় স্মৃতি পেছনে ফেলে যখন বের হলাম, মনে হলো বুকটা ফেটে যাচ্ছে। বড় ভাইকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো—কিন্তু সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো নয়। মনে হচ্ছিল, জলজ্যান্ত মানুষটাকে যেন একটা নিথর লাশের মতো স্ট্রেচারে করে তোলা হচ্ছে। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো পা, হাতে ঝুলছে স্যালাইনের ব্যাগ, আর ভাইয়ের সেই করুণ আর্তি! মানুষটা ব্যথায় নীল হয়ে গেছে, অসহায়ের মতো ছটফট করছে, আর আমরা ভাই-বোনেরা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। করার মতো কিছুই নেই আমাদের। ​আমি, মেঝ ভাই, বড় বোন আর দুলাভাই—আমরা সবাই ভাইয়ের মাথার কাছে জটলা পাকিয়ে বসে আছি। আমাদের সবার চোখেই জল, কিন্তু ভাইয়ের সামনে আমরা যেন পাথর হয়ে গেছি। একদিকে রাস্তার এই যানজট যেন শেষই হতে চায় না। একেকটা সেকেন্ড মনে হচ্ছে একেকটা বছর। জ্যামে গাড়ি আটকে থাকে, আর ভেতরে বড় ভাই ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। তার সেই গোঙানি আর ছটফটানি আমাদের কলিজায় গিয়ে বিঁধছিল। মনে হচ্ছিল, ইশ! যদি ভাইয়ের এই কষ্টটা নিজেরা ভাগ করে নিতে পারতাম! ​অবশেষে যখন আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে পৌঁছালাম, তখন যেন একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা পেলাম। ভর্তির পরপরই ডাক্তাররা দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন, শুরু হলো হাই পাওয়ারের সব মেডিসিন। কিন্তু নিয়তি কী নিষ্ঠুর! হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী রোগীর সাথে মাত্র একজন থাকতে পারবে। বুকভরা কষ্ট আর উৎকণ্ঠা নিয়ে বড় বোনকে ভেতরে রেখে আমরা তিনজন বেরিয়ে এলাম। ​হাসপাতালের ভেতরে ভাই শুয়ে আছে ব্যথায় কাতর হয়ে, আর আমরা তিনজন বাইরের ধূলামাখা রাস্তায় বসে আছি। রাত বাড়ছে, চারপাশ নিঝুম হয়ে আসছে, কিন্তু আমাদের চোখে ঘুম নেই। রাস্তার ধারে বসে বসে বড় ভাইয়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছে। মাঝেমধ্যে জরুরি প্রয়োজনে দৌড়ে ভেতরে যাই, ভাইয়ের মুখটা একবার দেখি, আবার ফিরে আসি ওই ফুটপাতে। ​রাস্তাটাই এখন আমাদের ঠিকানা। ভাইয়ের এই অসহায়ত্ব আর আমাদের এই নিরুপায় হয়ে রাস্তায় বসে থাকা—এই রাতটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ আর বেদনার এক রাত হয়ে থাকবে। প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটা পাহাড়সম কষ্ট বুকে চেপে বসে আছে। শুধু একটাই প্রার্থনা—ভাই যেন আবার সুস্থ হয়ে নিজের পায়ে হেঁটে আমাদের মাঝে ফিরে আসে। (রক্তে ভেজা শনিবার: একটি পঙ্গুত্বের দীর্ঘশ্বাস) ​তেরোটি দিন যমে-মানুষে টানাটানি চলছিল। আমরা ভেবেছিলাম ডাক্তারদের উন্নত চিকিৎসা হয়তো ভাইকে সুস্থ করে আমাদের কোলে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু নিয়তি যেন আড়ালে বসে অন্য এক বিভীষিকা লিখছিল। হঠাৎ একদিন ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে আমাদের ডেকে পাঠালেন। সেই কথাটি শোনার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। তারা জানালেন, “ভাইয়ের একটি পা আজই কেটে ফেলতে হবে। না হলে সংক্রমণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে, তাকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে যাবে।” ​এই সংবাদটি ঃ কানে এলো, মনে হলো পায়ের নিচের মাটি এক নিমিষেই সরে গেছে। বোন, বোনজামাই রিপন, মেঝভাই সিহাব—সবার চোখের কোণে শ্রাবণের মেঘ জমেছে। আতঙ্কে একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম, কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা কারো জানা ছিল না। সেই অভিশপ্ত দিনটি ছিল শনিবার। ​রাত গভীর হতে থাকল, আর অপারেশন থিয়েটারের দরজার বাইরে আমাদের প্রতীক্ষা দীর্ঘতর হলো। ভেতরে যখন ড্রিল মেশিনের মতো ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভাইয়ের জীবন্ত দেহ থেকে একটি পা বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছিল, বাইরে আমরা প্রতিটা সেকেন্ড যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছিলাম। সারারাত কাটার পর ভাইয়ের জ্ঞান ফিরছিল না। রাখা হলো আইসিইউ-তে। দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা পর যখন তাকে বেডে দেওয়া হলো, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল এক মর্মান্তিক দৃশ্য। ​একটি পা নেই, সেই কাটা অংশটুকু সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। ভাই যখন চোখ মেলে তাকাল, তার সেই দৃষ্টির কোনো জবাব আমাদের কাছে ছিল না। এক বুক হাহাকার নিয়ে ভাইয়ের সেই অসহায় চাহনি সহ্য করার শক্তি পৃথিবীর কোনো মানুষের নেই। আমরা যেন আস্ত একেকটা জীবন্ত লাশ হয়ে গেলাম। ​গ্রামের বাড়িতে তখন শোকের মাতম। মা-বাবার চোখের পানি নদী হয়ে বইছে। বাবার সেই আর্তনাদ গ্রামের বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। মসজিদ-মাদ্রাসায় দোয়া আর মিলাদ হচ্ছিল শুধু একটা প্রাণের আশায়—যেন বড় ভাই অন্তত বেঁচে থাকে। ​এদিকে ঢাকার রাজপথে আমরা তখন দিশেহারা। হাসপাতালের খরচ মেটাতে গিয়ে আমাদের অবস্থা নিঃস্ব হয়ে পড়ল। গাছের পাতার মতো টাকা খরচ হচ্ছিল, কিন্তু উন্নতির দেখা নেই। পকেটে টান পড়েছে, ব্যাংক ব্যালেন্স তখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। খাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমের দেখা নেই। চাতক পাখির মতো শুধু হাসপাতাল আর ফার্মেসির করিডোরে ঘুরেছি। ​হাসপাতালের বেডে শুয়ে ভাই তখন যন্ত্রণায় এপাশ-ওপাশ করতে পারত না। শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠে ঘা হয়ে গিয়েছিল। প্রেসাব-পায়খানা করার জন্য তাকে ওয়াশরুমে নেওয়ার মতো শক্তিও তার শরীরে অবশিষ্ট ছিল না। পরম মমতায় আমি নিজের হাতে ভাইয়ের মলমূত্র পরিষ্কার করেছি। সেই দিনগুলোতে কোনো ঘেন্না ছিল না, ছিল শুধু ভাইকে সুস্থ করার এক প্রবল আকুতি। পবিত্র ঈদুল আযহা দোরগোড়ায়, চারদিকে মানুষের মনে আনন্দ, আর আমাদের দিন কাটছে বিভীষিকার ​অবশেষে যখন একটি কেবিন পেলাম, তখন মনে হলো একটুখানি নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা হলো। কতদিন গোসল করিনি, কত রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি তার হিসেব নেই। কেবিনে উঠে আমি, বড় বোন আর ভাই মিলে যখন গোসল করলাম, মনে হলো শরীরের সব ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে। ​ডাক্তার জানালেন, এই দীর্ঘ সময়ে ভাইয়ের শরীরে ১৮ বার অপারেশন হয়েছে, ৪ বার আইসিইউ-তে নিতে হয়েছে এবং শরীরের অভাব মেটাতে ২৮ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। অবশেষে ঈদের ঠিক আগে ডাক্তাররা পাঁচ দিনের জন্য গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। ​অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে যখন বাড়ির দিকে রওনা দিলাম, তখন বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসছিল। কতদিন পর মুক্ত আকাশের নিচে প্রাণভরে শ্বাস নিলাম মনে নেই। ভাইয়ের এই পঙ্গুত্ব আমাদের বুকের ভেতর এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকলেও, তাকে জীবন্ত অবস্থায় গ্রামে নিয়ে ফিরতে পারছি—এটাই ছিল আমাদের কাছে বড় পাওয়া। সেই শনিবারের ক্ষত হয়তো কোনোদিন মুছবে না, কিন্তু ভাইয়ের বেঁচে থাকাটাই আমাদের কাছে এখন পরম সম্পদ। হাসপাতালের সেই চার দেয়ালের গুমোট অন্ধকার আর ওষুধের কটু গন্ধ কাটিয়ে যখন ভাইকে স্ট্রেচারে করে রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সের সামনে আনলাম, তখন সূর্যটা যেন বড্ড বেশি উজ্জ্বল ছিল। কতদিন পর আমার ভাই দিনের আলো দেখল! কিন্তু সেই আলোতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম। এ কি আমার সেই প্রাণবন্ত ভাই? গাল দুটো দেবে গেছে, চোখের কোণে কালি, শরীরটা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে। চেনা মানুষটাকেও আজ অচেনা মনে হচ্ছে। ​ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাজপথ দিয়ে যখন অ্যাম্বুলেন্সটা ছুটছিল, জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল—এই শহরটা কত নিষ্ঠুর! সবাই যার যার গন্তব্যে ছুটছে, অথচ আমার ভাইয়ের জীবনটা থমকে গেছে এক অজানা গন্তব্যে। কেন তার সাথেই এমন হলো? এই হাহাকারের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই পৃথিবীতে। ​দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে যখন গ্রামের মেঠোপথ ধরে আমাদের বাড়িতে পৌঁছালাম, দেখলাম মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সবাই যেন এক পলক দেখার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে যখন তার নিজের হাতে সাজানো সেই ‘ফুলের মতো’ গুছিয়ে রাখা ঘরটিতে শোয়ালাম, তখন মনে হলো ঘরের দেয়ালগুলোও যেন অবাক হয়ে তাকে দেখছে। যে ঘরে সে একদিন রাজার মতো বিচরণ করত, আজ সেই ঘরটাও যেন তাকে চিনতে পারছে না। ​মাঝরাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা চলল। লাইনের পর লাইন ধরে মানুষ এক নজর দেখে যাচ্ছে সেই বদলে যাওয়া মুখটি। অনেক আর্তনাদ আর কোলাহলের পর যখন রাতটা একটু গভীর হলো, ভাই আমার নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানায় প্রথম শান্তির ঘুমটা দিল। ​সামনে সোমবার পবিত্র ঈদুল আযহা। আমরা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। আমাদের বাবা ছিলেন হার্টের রোগী, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও ছিল। তাই ভাইয়ের এই ক্ষতবিক্ষত অবস্থা থেকে তাকে দূরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আমরা। কিন্তু নিয়তিকে কি আর আড়াল করা যায়?​শুক্রবার রাত। মেঝ ভাই ডাক্তার সিহাব বড় ভাইয়ের সেই ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করছিল। আমি ভাইয়ের শিথানে বসে গভীর মমতায় তার মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছি। ঠিক সেই মুহূর্তে বাবা ঘরে ঢুকলেন। বড় ছেলের সেই কাটা পা, সেই ভয়াবহ ক্ষত দেখে বাবার শরীরটা যেন পাথর হয়ে গেল। ঘামতে ঘামতে তিনি পাশের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লেন। আমরা দ্রুত ক্ষতটা ঢেকে দিলাম, কিন্তু যা দেখার বাবা তা দেখে ফেলেছেন। ​বাবা তার তিন ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন। অদ্ভুত এক শান্ত স্বরে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। দোয়া করলেন আমাদের জন্য। হাসপাতালের প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব দিলেন আমাদের। সবশেষে বললেন: ​”তোমরা ভালো থাকিস বাবা, সাবধানে চলিস। আমার দোয়া তোদের সাথে সবসময় আছে।” ​বাবার এই শেষ কথাগুলো যে আসলে চিরবিদায়ের ইঙ্গিত ছিল, তা আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। বাবা চলে গেলেন তার ঘরে, আমরা আবার ভাইয়ের ড্রেসিংয়ে মন দিলাম। রাত ১২টার দিকে ভাইকে ঘুম পাড়িয়ে আমরাও ক্লান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। ​শনিবার সকাল। বাবা যথারীতি ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়লেন। আমাদের প্রত্যেককে পরম মমতায় ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলেন। এরপর বড় ভাইয়ের রুমে গিয়ে তাকে এক পলক দেখে নিলেন—হয়তো শেষবারের মতো তৃপ্তিভরে নিজের সন্তানকে দেখে নিলেন বাবা। ​এরপর বাবা খুব সুন্দর করে ফ্রেশ হয়ে, পরিপাটি করে চুল আঁচড়ালেন। ঈদের জন্য কেনা গরু দুটির কাছে গেলেন। গরুর দেখাশোনা শেষে সোজা চলে গেলেন হুজুরের কাছে, ঈদের দিন গরু জবাইয়ের মজুরি আগেভাগেই শোধ করে দিলেন। যেন দুনিয়ার সব দেনাপাওনা মিটিয়ে দিতে চাইছিলেন তিনি। দোকান থেকে ঈদের বাজারও করলেন। ​কিছুক্ষণ পরিচিত মানুষদের সাথে বসে চা-পান খেলেন। হাসিমুখে কথা বললেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বাবার শরীরটা প্রচণ্ড ঘামতে শুরু করল। মানুষজন ধরাধরি করে তাকে পাশের একটি দোকানের ফ্যানের নিচে বসাল। ঠান্ডা পানি আর জুস খাওয়ানো হলো তাকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে…কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বাবা যখন কিছুটা সুস্থ অনুভব করলেন, তখন দোকানদারকে বললেন, “বাজারগুলো ব্যাগে গুছিয়ে রাখো, সাব্বির এসে নিয়ে যাবে।” এই বলে তিনি বাজারের ভিড় ঠেলে বাড়ির পথ ধরলেন। ​রাস্তার এক পাশে আমি, অন্য পাশে বাবা। বাবা আমার দিকে ঝাপসা চোখে টলমল করে তাকিয়ে আছেন। জীবনের এতগুলো বছরে বাবাকে কোনোদিন আমার দিকে এভাবে তাকাতে দেখিনি। বাবার সেই অদ্ভুত চাউনি দেখে মনের ভেতর অজানা এক ভয় জেঁকে বসল। আমি কিছুটা আতঙ্কিত হয়েই বাবার আগে আগে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ​বাড়ির প্রধান ফটক পর্যন্ত পৌঁছেছি মাত্র, অমনি পেছন থেকে কারো চিৎকার শুনতে পেলাম— “সাব্বির! তোর বাবা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছে!” ​বুকে পাথর নিয়ে দৌড়ে গিয়ে দেখি, লোকজন বাবার মাথায় পানি ঢালছে। কিছুক্ষণ পর বাবা চোখ মেললেন, উপস্থিত সবাইকে দেখে মৃদু একটা হাসিও দিলেন। কিন্তু সেই হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি আবারও নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়লেন। উপস্থিত ডাক্তার তখন গম্ভীর মুখে বললেন, “অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না, ওনাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।”সেদিন ছিল কোরবানির ঈদের মাত্র দুই দিন বাকি, শনিবার। আমাদের গোপালপুরে শনিবার মানেই পশুর হাটের ব্যস্ততা। চারদিকে মানুষের ভিড় আর গাড়ির জ্যামে রাস্তা স্থবির। যখন ডাক্তার বললেন, “বাবার প্রেশার আর পাওয়া যাচ্ছে না,” তখন আমাদের পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল। তড়িঘড়ি করে বাবাকে নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। মেজ ভাই সিহাব একপাশে বসলো, আর আমি বাবার মাথার কাছে। শুরু হলো এক অনিশ্চিত যাত্রা।​রাস্তার দিকে তাকাই আর দেখি জ্যামের পাহাড়, আর বাবার দিকে তাকালে কলিজা ফেটে যায়। বাবা ক্ষীণ স্বরে কেবল ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ জিকির করছিলেন। তাঁর সেই স্পষ্ট উচ্চারণ আজও আমার কানে বাজে। কিন্তু মাঝপথে পৌঁছাতেই বাবার কণ্ঠ থেমে গেল। সিহাব ভাই ইশারায় বুঝালেন বাবা আর নেই। গাড়ির ভেতরে তখন শুধু দুই ভাইয়ের কান্নার রোল। সেই অবস্থায় বোন আর দুলাভাইকে ফোন করলাম। তাঁরা যখন রাস্তায় আমাদের গাড়ির কাছে পৌঁছালেন, বাবা যেন শেষবারের মতো একবার চোখ মেলে তাঁর মেয়েকে দেখলেন। তারপর চিরতরে বুজে গেল সেই স্নেহময় চোখ দুটো। ​হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তাররা ইসিজি করে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিলেন বাবা মৃত—তখন মনে হলো পৃথিবীটা এক নিমেষে নিঃস্ব হয়ে গেছে। হাসপাতালের বারান্দায় কাটানো সেই মুহূর্তগুলোর যন্ত্রণা কেবল পরম করুণাময় আল্লাহই জানেন। বড় বোন সালমা, মেজ বোন শাপলা আর রিপন দুলাভাইসহ সবাই যখন হাসপাতালে পৌঁছালেন, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। ​বাবার নিথর দেহটা নিয়ে আবার বাড়ির পথে রওনা হলাম। গাড়িতে বাবার মাথাটা ছিল আমার ঊরুর ওপর। যে মানুষটা একসময় আমাদের আগলে রাখতেন, আজ তিনি প্রাণহীন। বাড়ির উঠানে পা রাখতেই কান্নার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ওদিকে আমার বড় ভাই সেলিম, যার একটা পা নেই বলে বিছানা থেকে নড়তে পারেন না, তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু চোখের জল ফেলছিলেন। ​গ্রামের মাতব্বর আসলেন, মাইকিং হলো। কেউ ছুটল কবর খুঁড়তে, কেউ বাঁশ কাটতে, আর কেউ খাটিয়া আনতে। আমি তখনো এতিমের মতো বাবার শিয়রে বসে আছি। মা আর ভাই-বোনদের কান্নায় চারপাশ হাহাকার করছিল। বাবাকে শেষ গোসল করিয়ে যখন সাদা কাফনে মুড়িয়ে খাটিয়ায় শোয়ানো হলো, তখনো বড় ভাই তাঁর বাবার মুখটা দেখতে পাননি। ​জানাজার উদ্দেশ্যে যখন বাবার খাটিয়া বাড়ি থেকে বের করা হবে, তখন বড় ভাইয়ের শেষ দেখার জন্য খাটিয়াটি তাঁর রুমের ভেতরে নেওয়া হলো। অসুস্থ শরীর নিয়ে ভাইয়ের সেই গগনবিদারী চিৎকার আজও আমার কানে বাজে। সেই চিৎকার ভোলার মতো নয়। ​আমি আর মেজ ভাই বাবার খাটিয়া কাঁধে তুলে নিলাম। নবগ্রাম দাখিল মাদরাসা মাঠে যখন পৌঁছালাম, তখন জনসমুদ্র। পুরো মাঠ মানুষে পূর্ণ। জানাজা শেষে বাবাকে অন্ধকার মাটির ঘরে শুইয়ে দিলাম। নিজ হাতে মাটি দেওয়ার পর আর নিজেকে সামলাতে পারিনি; জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ​বড় ভাই হিসেবে জানাজায় অংশ নিতে না পারা সেলিম ভাইয়ের কষ্টটা ছিল অন্যরকম। তিনি বাড়ি থেকে কিছু মাটি চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। সেই মাটিতে তিনবার হাত দিয়ে তিনি তাঁর মনের আক্ষেপ আর দোয়া মিশিয়ে দিয়েছিলেন, যা পরে বাবার কবরে দেওয়া হয়। কী এক ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলেন আমার ভাই! পা হারিয়ে একদিকে পঙ্গুত্ব, অন্যদিকে বাবার জানাজায় শরিক হতে না পারার চিরস্থায়ী আক্ষেপ। ​আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় বাড়িতে আনা হলো। ঘরভর্তি মানুষ, চারদিকে শোকের মাতম। বড় আপা আর বোনদের কান্নায় যেন বন্যার জোয়ার নেমেছে। আর আমার আহত পাখির মতো বড় ভাই সেলিম, বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিলেন—বাবার জন্য, আর নিজের অসহায়ত্বের জন্য। ​জ্ঞান ফেরার পর দেখি ঘরভর্তি মানুষ। সবার মুখে কান্নার আহাজারি। আমি কোনো উপায় না পেয়ে পবিত্র কোরআন শরিফ তিলাওয়াত শুরু করলাম, আর আমার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। শনিবার কাটল, রবিবারও পার হলো এক চরম অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে। পরদিন সোমবার—পবিত্র ঈদুল আজহা। সবার বাড়িতে যখন ঈদের আনন্দ, আমাদের বাড়িতে তখন চলছে শোকের মাতম। আব্বাকে ছাড়া সেমাই-পিঠা কিছুই মুখে নিতে পারছিলাম না। তবুও গোসল শেষ করে ঈদের নামাজ পড়তে গেলাম এবং বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করলাম।​বাড়ি ফিরে কিছু না খেয়েই যখন কোরবানির কাজ দেখছিলাম, তখনই খবর এল বড় ভাইয়ের অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করেছে। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে আবার ঢাকায় পাঠানো হলো। ধরা পড়ল ডেঙ্গু জ্বর। মেজো ভাই, দুলাভাই আর বড় আপা ভাইয়ের সাথে ঢাকায় চলে গেলেন। বাড়িতে রইলাম আমি, মা আর মেজো বোন।​এদিকে বাবার কুলখানির সময় ঘনিয়ে এল। শোকাতুর মনেই গ্রামের মানুষের ওপর সব দায়িত্ব দিয়ে বাবার কুলখানির আয়োজন সম্পন্ন করলাম। মানুষকে খাওয়ানোর পর্ব শেষ হতেই আমি আবারও বড় ভাইয়ের কাছে ঢাকার হাসপাতালে ছুটে গেলাম। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ভাই কিছুটা সুস্থ হলে তাকে বাড়িতে আনা হয়। ​এরপর দীর্ঘ দুটি বছর বড় ভাই শয্যাশায়ী ছিলেন। অভাব আর দুশ্চিন্তার কালো মেঘ আমাদের ওপর ভর করেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে তিনি আবার হাঁটার শক্তি ফিরে পেলেন। আজ তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে বিয়ে করে সংসার করার তৌফিক দান করেছেন। আমার মেজো ভাই এখন একজন সফল চিকিৎসক, আর আমিও কর্মরত আছি। ​আজ আমাদের জীবনে সচ্ছলতা এসেছে, পরিবারের সুদিন ফিরেছে। কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে সেই দগদগে ক্ষত রয়েই গেছে। আজ সব আছে, শুধু আমাদের প্রিয় বটবৃক্ষ—আব্বা নেই। তার শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার আব্বাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।
Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেন্ডার
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  
আরও ভোরের বাংলাদেশ সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com