ভােরের বাংলাদেশ”
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হয়েও নিজেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে নিতে চায় চীন। ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জাতিসংঘে ঘোষণা করেছিলেন; ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করবে চীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌর ও বায়ুশক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ সেই লক্ষ্যকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন জলবায়ু প্রতিশ্রুতি শিথিল করায় বৈশ্বিক নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই জায়গায় বেইজিং নিজেকে তুলে ধরছে ‘সবুজ সুপারপাওয়ার’ হিসেবে। তবে এই রূপান্তর নিখুঁত নয়। অতিরিক্ত উৎপাদন, মূল্যযুদ্ধ, স্থানীয়দের জমি হারানোর অভিযোগ এবং কয়লা শিল্পে কর্মরত লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ; সব মিলিয়ে প্রশ্নও কম নয়।
চীন একই সঙ্গে দুই দৌড়ে নেমেছে : একদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অন্যদিকে কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে আধিপত্য। মরুভূমি, পাহাড়, ডুবে যাওয়া খনি; সবখানেই চলছে পরিবর্তনের গল্প।
ইননার মঙ্গোলিয়ার প্রান্তরে দাঁড়ালে বোঝা যায় পরিবর্তন কতটা গভীর। আগে যেখানে শুকনো বাতাস আর উড়ন্ত ধুলো ছিল, এখন সেখানে ঝলমলে সৌর প্যানেল। স্থানীয় কৃষকরা বলেন, প্যানেলগুলো আংশিক ছায়া তৈরি করে, বাতাসের গতি কমায়, ফলে ঘাস কিছুটা টিকে থাকে। মরুকরণ থেমে যায়নি কিন্তু ক্ষতি কিছুটা কমেছে। এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার নতুন পরীক্ষাও বটে।
চীন গত এক দশকে সৌর ও বায়ুশক্তিতে যে বিনিয়োগ করেছে, তা নজিরবিহীন। তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে চীন একাই বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার সমান বা তার চেয়েও বেশি নতুন সক্ষমতা যুক্ত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে চীনের উৎপাদন এখন প্রাধান্যশীল। ফলে পাকিস্তান থেকে জামাইকাÑ অসংখ্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে চীনা প্রযুক্তি।
এই উত্থানের পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, সস্তা ঋণ ও কৌশলগত পরিকল্পনা। আশি দশকে বাণিজ্য উন্মুক্ত করার পর যেমন শিল্পশক্তিতে রূপান্তর ঘটেছিল, এবার তেমনি নবায়নযোগ্য শক্তিতে শিল্প বিপ্লব ঘটাতে চাইছে বেইজিং। কয়লা ছিল সস্তা ও সহজলভ্য; তাই ২০০৬ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে কার্বন নিঃসরণে শীর্ষে ওঠে। এখন সেই দেশই নিজেকে কার্বন নিরপেক্ষতার পথে দেখাতে চায়।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে সোলার খাতে মূল্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে। অনেক বড় নির্মাতা ক্ষতির মুখে পড়েছে। কয়েকটি প্রদেশে বাতিল হয়েছে ডজনখানেক প্রকল্প। বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও গ্রিডে সংযুক্তির সীমাবদ্ধতাও বড় চ্যালেঞ্জ। এখনও চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই কয়লানির্ভর।
গ্রামের মানুষদের উদ্বেগও কম নয়। ইউনান প্রদেশে চা বাগানের জায়গায় বসছে সৌর প্যানেল। কিছু কৃষক অভিযোগ করেন, যথাযথ পরামর্শ বা স্বচ্ছতা ছাড়াই জমি লিজ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ভিডিও দেখা গেলেও তা দ্রুত মুছে যায়। উন্নয়নের গতি এত দ্রুত যে স্থানীয় মতামত প্রায়শই চাপা পড়ে যায়।
পরিবেশগত প্রশ্নও আছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি শিল্পের জন্য বিরল খনিজ আহরণে বড় পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। খোলা খনিতে মাটি ও পানির দূষণ বাড়ছে। ফলে সবুজ শক্তির পথও সম্পূর্ণ নির্মল নয়। একই সঙ্গে কয়লা শিল্পে কর্মরত লক্ষ মানুষের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও অস্পষ্ট।
তবু অর্জন অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিষ্কার শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি চীনের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রবৃদ্ধিকে প্রায় পুরোপুরি সামাল দিচ্ছে। বায়ু ও সৌরশক্তির অংশ দ্রুত বাড়ছে। কেউ কেউ মনে করেন, প্রযুক্তিগত ব্যবধান এতটাই বেড়েছে যে অন্য দেশগুলোর পক্ষে দ্রুত ধরা কঠিন হবে।
চীন তাই এক দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। একদিকে কয়লা প্লান্ট চালু রেখে অর্থনীতির চাকা ঘোরানো, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের দাবি। মরুভূমিতে সৌর খামার, ডুবে যাওয়া কয়লাখনির ওপর ভাসমান প্যানেল- সবই সেই রূপান্তরের প্রতীক। প্রশ্ন রয়ে যায়, এই দ্রুত সবুজ বিপ্লব কি টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত পথে এগোবে, নাকি নতুন বৈষম্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে? বিশ্বের জলবায়ু রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়বেই।
