ড. মোছাঃ ফারহানা শারমিন
রোজেলা বা চুকুর—বাংলাদেশে নতুন হলেও বিশ্বের বহু দেশে দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি ভেষজ ও অর্থকরী ফসল। মালভেসি পরিবারের পাটজাতীয় এ উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Hibiscus sabdariffa L.। আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলে সুদানে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে রোজেলার চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৬শ-১৭শ শতকে মিশর, পশ্চিম আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঔষধি ও পানীয় উপাদান হিসেবে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বহু বছর ধরে “চুকুর চুকাই, চুকুরি, মেস্তা” নামে পরিচিত এই সম্ভাবনাময় ফসল বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বিজেআরআই এর গবেষণায় রোজেলার নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) রোজেলা নিয়ে দেশে সংগঠিত গবেষণা ও জাতউন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রদূত। বন্য প্রজাতির মেস্তা থেকে বিশুদ্ধ সারি নির্বাচন ও প্রজনন গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে উচ্চফলনশীল ও সবজি হিসেবে উপযোগী “বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১)” জাত, যা ২০১০ সালে জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক অবমুক্ত হয়। এ ছাড়াও এখন পর্যন্ত মোট পাঁচটি মেস্তা জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যার মধ্যে দুটি সবজি হিসেবে খরা উপযোগী।
ফাইবার কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট বিভাগের সিএসও (সিসি) ড. মো. আবুল ফজল মোল্লা ২০১৫ সাল থেকে রোজেলার চাষ ও বাণিজ্যিকীকরণ জনপ্রিয় করতে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার নির্দেশনা ও সহযোগিতায় রোজেলা চাষ প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে, যখন হাজী মো. দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী তার প্রশিক্ষণ নিয়ে রোজেলা চাষ শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা “ক্যালিক্স ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড” নামে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে রোজেলা চা উৎপাদন শুরু করেন এবং ইয়ং বাংলা আয়োজিত স্টুডেন্ট টু স্টার্টআপ প্রতিযোগিতায় ২২৫০ দলের মধ্যে রানার্সআপ হন।
অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প
গবেষকদের সহযোগিতায় পাবনার সাঁথিয়ায় প্রথমবারের মতো চার বিঘা জমিতে রোজেলা চাষ করে উদ্যোক্তারা ৩.৫ টন কাঁচা ক্যালিক্স সংগ্রহ করেন। প্রক্রিয়াজাতের পর তা হয় ৩২০ কেজি শুকনা ক্যালিক্স—যার বাজারমূল্য প্রায় ১২ লাখ টাকা। এর পর নাটোরের ঔষধী গ্রামের উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলামসহ আরও অনেকে রোজেলা চাষে যুক্ত হন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে রোজেলা চা নিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার—ফসলটির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
রোজেলার স্বাস্থ্যগুণ
রোজেলার কাণ্ড, পাতা ও ফুলে রয়েছে অসংখ্য বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ—অ্যান্থোসায়ানিন, ফেনলিক কম্পাউন্ড, ফ্ল্যাভোনয়েড, ভিটামিন সি এবং প্রোটোক্যাটেচুইক অ্যাসিড, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা যায়, রোজেলা চা—
রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
ক্যান্সার প্রতিরোধে সম্ভাবনা রাখে
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
বিভিন্ন ধরনের ব্যথা প্রশমনে কার্যকর
শুকনা রোজেলা ফুল পাঁচ মিনিট মাঝারি আঁচে ফুটিয়ে গরম বা ঠান্ডা পানীয় হিসেবে পান করলে তা শরীরে সতেজতা এনে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
গবেষণা ও শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত
বিজেআরআই-এর পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা রোজেলা থেকে চা, জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি, জুসসহ নানা খাদ্যপণ্যের গবেষণা করছে। এছাড়া চুকুর পাতার বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ পোল্ট্রিতে ফিড অ্যাডিটিভ হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণাও শুরু হয়েছে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে।
উদ্ভিদটির বহুমুখী ব্যবহার, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চচাহিদা রোজেলাকে ভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসলে পরিণত করতে পারে। শুধু পানীয় নয়, রোজেলা এখন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক।
লেখক :
উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা,
ফাইবার কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট বিভাগ, বিজেআরআই।
