নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে বিস্তর অনিয়ম, দুর্নীতি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপোর জেনারেল ম্যানেজার কামরুজ্জামান ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী। সম্প্রতি ড্রাইভার মোহাম্মদ আরিফের মৃত্যুর ঘটনা এই অভিযোগগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। ড্রাইভার আরিফের মৃত্যু: মানসিক চাপে ভেঙে পড়ার অভিযোগ গত ১৩ মার্চ […]
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে বিস্তর অনিয়ম, দুর্নীতি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপোর জেনারেল ম্যানেজার কামরুজ্জামান ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী। সম্প্রতি ড্রাইভার মোহাম্মদ আরিফের মৃত্যুর ঘটনা এই অভিযোগগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ড্রাইভার আরিফের মৃত্যু: মানসিক চাপে ভেঙে পড়ার অভিযোগ
গত ১৩ মার্চ ২০২৬ রংপুরের তারাগঞ্জ এলাকায় বিআরটিসির একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় মারা যান ড্রাইভার মোহাম্মদ আরিফ। তার পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ—দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গালাগালি, হুমকি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার ছিলেন তিনি।
আরিফের স্ত্রী বলেন, “ম্যানেজার নিয়মিত আমার স্বামীকে অপমান করতেন ও ভয় দেখাতেন। মানসিক চাপেই সে ভেঙে পড়ে, যার পরিণতি এই মৃত্যু।”
পরিবার আরও অভিযোগ করেছে, দুর্ঘটনার পর ডিপো কর্তৃপক্ষ আরিফের স্ত্রীর কাছ থেকে সাদা কাগজে ও বিআরটিসির ফরমে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করে, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
ডিপো–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মালবাহী ট্রাকের অতিরিক্ত ট্রিপের ভাড়া অফিসে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা গোপনে ভাগাভাগি করা হয়। এ কাজে ইলিয়াস নামের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিটি ট্রাক থেকে ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ড্রাইভারদের খারাপ রুট বা কম আয়ের ট্রিপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
ড্রাইভারদের ওপর চাপ ও বেতন আটকে রাখা
অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশ না মানলে ড্রাইভারদের গাড়ি কেড়ে নেওয়া বা চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়। ভালো রুট পেতে হলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ড্রাইভারদের বেতন আটকে রেখে কাজ করানো হয়—যা আরিফের ক্ষেত্রেও ঘটেছে বলে দাবি পরিবারের।
চাকরি পরিবর্তন ও ‘আনফিট’ গাড়ি চালানোর অভিযোগ
পরিবারের দাবি, আরিফের নামে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাকে হঠাৎ চালকের পদ থেকে সরিয়ে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। পরে ড্রাইভার সংকট দেখা দিলে তাকে একটি “আনফিট” ট্রাক চালাতে দেওয়া হয়, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
ঋণ ও মানসিক চাপ
আরিফ প্রায় ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় তাকে গালিগালাজ, হুমকি ও চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়—যা তার মানসিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে বলে পরিবারের দাবি।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
গোপন সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম ডিপো থেকে মাসে ৩০–৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত আদায় হলেও অফিসে জমা দেওয়া হয় মাত্র ১২–১৩ কোটি টাকা। বাকি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অল্প সময়ে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ব্যবস্থাপকের বক্তব্য মেলেনি
এ বিষয়ে ডিপোর জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আরিফকে পূর্বে কতবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল—এ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি বলে জানা গেছে।
তদন্তের দাবি
আরিফের পরিবার, সহকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিআরটিসির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
তাদের মতে, এটি কোনো সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও মানসিক নির্যাতনের একটি গুরুতর প্রতিফলন, যা বিআরটিসির ভাবমূর্তির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।