ছবি: <--ছবির সোর্স সিলেক্ট করুন-->
রাঙামাটি প্রতিনিধি : মো. নাজিম আলী
টানা ভারী বর্ষণে রাঙামাটিতে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ১০ উপজেলায় ২১২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সাজেক ভ্যালীসহ জেলার সব পর্যটন স্পটে ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাঙামাটি জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই ও বাঘাইছড়ি উপজেলার ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৮০৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে আশ্রিতদের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাঙামাটি জেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে টানা বর্ষণে রাঙামাটি পৌরসভার তবলছড়ি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ১ নম্বর কর্মচারী কলোনি, ওমদামিয়া হিল রোড, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মুসলিমপাড়া, ভেদভেদীসহ কাউখালী, বাঘাইছড়ি, বরকল, কাপ্তাই এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
একই সঙ্গে কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাঙামাটির কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির ৫টি ইউনিট চালু রয়েছে এবং এসব ইউনিট থেকে মোট ১৪৪ মেগাওয়াট (MW) বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে।
সম্ভাব্য ভূমিধস নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিবেশগত ও ভৌগোলিক তথ্য পরিষেবা কেন্দ্র (সিইজিআইএস) জিআইএসভিত্তিক বৃষ্টিপাতের থ্রেশহোল্ড মডেলিং পদ্ধতিতে তিন পার্বত্য জেলায় গবেষণা পরিচালনা করে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতে মোট বৃষ্টিপাত ৩৭৫ মিলিমিটারে পৌঁছালে এবং ঘণ্টায় গড়ে ৮ দশমিক ১০ মিলিমিটারের বেশি হারে বৃষ্টি হলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়।
রাঙামাটি সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৬টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে ঘণ্টায় গড় বৃষ্টির হার ছিল ১১ দশমিক ৯৫ মিলিমিটার, যা গবেষণায় নির্ধারিত ঝুঁকির মাত্রার চেয়েও বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মোট বৃষ্টিপাত ৩৭৫ মিলিমিটার অতিক্রম করতে পারে এবং পাহাড়ধস ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় চলাচল ও ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
এদিকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে পাঁচ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান।
তিনি জানান, খাগড়াছড়ির দিঘীনালা–বাঘাইহাট–সাজেক সড়কের একাধিক নিচু স্থানে পাহাড়ি ঢলের পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পাঁচ শতাধিক পর্যটক ফিরতে পারছেন না। তাদের নিরাপদে বিভিন্ন রিসোর্ট, কটেজ ও আবাসনকেন্দ্রে অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
ইউএনও আরও জানান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সড়কের পানি নেমে গেলে এবং যাতায়াত নিরাপদ হলে পর্যটকদের পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ গন্তব্যে পাঠানো হবে।
দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালীসহ রাঙামাটির সব পর্যটন স্পটে ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। নতুন কোনো পর্যটককে পাহাড়ি এলাকায় না যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সর্বসাধারণকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।