ভােরের বাংলাদেশ”
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়া, প্রচলিত বাজারে মন্দা ও নানামুখী বাণিজ্যিক বাধার কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন নতুন বাজারের দিকে জোর দিচ্ছে। বর্তমানে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্ভরতা বেশি, মোট রপ্তানির বড় অংশ এখনো এই দুই বাজারে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নানা ধরনের শর্ত আরোপের জন্য নতুন বাজারের খোঁজে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাত। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারে ভোক্তা বাজার দ্রুত বাড়ছে। এ ছাড়া ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলির মতো লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় বাড়ছে নতুন ক্রেতা। আফ্রিকার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া রয়েছে দীর্ঘমেয়াদে বড় সম্ভাবনা। অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে রয়েছে উচ্চমান সম্ভাবনা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান (বাবু) খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গড়ে প্রতি অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ এই খাত থেকে এসেছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে একটি বড় ঝুঁকি—অতিরিক্ত বাজারনির্ভরতা। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই দুই বাজারেই রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ। নির্দিষ্ট কয়েকটি গন্তব্যে এত বেশি নির্ভরশীলতা একদিকে যেমন স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করে, অন্য দিকে বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নীতিগত পরিবর্তনের সময় পুরো খাতকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এই বাস্তবতায় নতুন ও অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশের উদ্যোগকে পোশাক খাতের জন্য সময়োপযোগী ও কৌশলগত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ী এই নেতা।
ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা
বর্তমানে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দেশ হচ্ছে চীন ও ভিয়েতনাম। চীন বহুদিন ধরেই এ খাতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, তবে দেশটির উচ্চ মজুরি, পরিবেশ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ধীরে ধীরে কিছু বাজার হারাচ্ছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা রক্ষণশীল আচরণ করছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম একটি শক্তিশালী প্রতিযোগী। দেশটি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উচ্চতর কর্মক্ষমতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক বায়ারের কাছে বিশ্বস্ত। এ ছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসহ আরও কয়েকটি চুক্তির আওতায় বাণিজ্য জোটে যুক্ত থাকার কারণে ভিয়েতনাম বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
নীট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান এখানে মাঝামাঝি। একদিকে আমাদের শ্রম সস্তা, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠায় আমরা বিশ্ববাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছি। কিন্তু এখনো অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ব্যবহার ও ব্র্যান্ডিংয়ে পিছিয়ে আছি।
নতুন বাজারে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিলিয়ে নতুন বাজারে রপ্তানির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ১৪ শতাংশের কিছু বেশি।
খাত সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ছিল এই অংশকে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। বরং পরিসংখ্যান বলছে, নতুন বা অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এসব বাজারে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ। বিশেষ করে রাশিয়া ও তুরস্কে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ, আর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কমেছে ৬ শতাংশেরও বেশি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং ভোক্তা ব্যয়ের চাপ এসব বাজারে চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজার
সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজারগুলোর মধ্যে জাপানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে জাপানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। গত এক দশকে এই বাজারে রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তবু জাপানের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ এখনো ৪ শতাংশের নিচে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বড় হলেও সেখানে মান নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত সেলাই, উচ্চমানের ফিনিশিং এবং সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব মানদণ্ড পূরণ করা এখনো দেশের সব কারখানার পক্ষে সহজ নয়।
ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। গেল অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল আনুমানিক ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ৩ শতাংশের মতো। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, সীমান্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় ভারতের নীতিগত অবস্থান এই বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চীনের বাজারে প্রবেশ আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদক দেশ হওয়ায় সেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র। ২০২৪ সালে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে চীনের মোট পোশাক আমদানি বাজারের আকার ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশ ১ শতাংশেরও কম। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পণ্য ছাড়া চীনের বাজারে টিকে থাকা কঠিন।
বিপণন দুর্বলতা ও কাঠামোগত বাধা
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নতুন বাজারে পিছিয়ে পড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে বিপণন দুর্বলতা এবং বাজার গবেষণার অভাব। বিজিএমইএর তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাক কারখানা এখনো ক্রেতানির্ভর অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি কিংবা সরাসরি বিদেশি খুচরা বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে নতুন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দৃশ্যমানতা তৈরি হতে সময় লাগছে।
এ ছাড়া নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৪ শতাংশে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে যেখানে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, সেখানে নতুন বাজারে বাংলাদেশকে দামে কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে।
ইতিবাচক দিক ও সম্ভাবনার জায়গা
সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পোশাক খাতে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে। ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৩০টির বেশি স্বীকৃত গ্রিন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি রয়েছে, যা বিশ্বের মোট গ্রিন কারখানার প্রায় ৫৫ শতাংশ।
এই অর্জনকে নতুন বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ইউরোপের বাইরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে টেকসই উৎপাদন এখন বড় আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বলছে, বাজার বহুমুখীকরণে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে নতুন বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতামত
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন বাজারের সন্ধান এখন শুধু কৌশলগত লক্ষ্য নয়, বরং সময়ের দাবি। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, উদ্যোগ থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত। কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া নতুন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা কঠিন হবে। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে না পারলে বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে দেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ এখনো শক্ত অবস্থানেই রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতে হলে দেশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। শুধু শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে একদিকে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কার্যদক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ শিল্পায়িত রাষ্ট্র হওয়ার সক্ষমতা রাখে। সে লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমানো এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য সবাইকে আরও প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে। যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া যাবে, ততই ভোগান্তি কমবে।
তৈরি পোশাকশিল্পের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও মোড়ক পণ্য সরবরাহকারী কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, গার্মেন্ট মেশিনারিজ, অ্যাক্সেসরিজ, প্যাকেজিং পণ্য, কাঁচামালসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রচার-প্রসার এবং নতুন ক্রেতা অনুসন্ধানে বিজিএপিএমইএ ও এএসকে একসঙ্গে কাজ করছে। এই প্রদর্শনী তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন।
