ছবি: <--ছবির সোর্স সিলেক্ট করুন-->
মোঃ মনিরুজ্জামান, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
একটি ছোট্ট শিশু যন্ত্রণায় কাঁদছে। তাকে কোলে নিয়ে কখনো মা, কখনো বাবা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কান্না থামছে না। কারণ শিশুটির হৃদ্যন্ত্রে রয়েছে দুটি ছিদ্র। চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ জোগাড় করার সামর্থ্য নেই পরিবারের।
শুধু ছোট সন্তানটিই নয়, আরেক সন্তানও জন্ম থেকেই হাঁটতে পারে না। এর ওপর দুই অসুস্থ সন্তানের বাবা এজাজুল ইসলাম নিজেও কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। তবু পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিন কাজে যেতে হচ্ছে তাকে।
এ যেন এক পরিবারের ওপর একসঙ্গে নেমে আসা দুঃখের পাহাড়।
এজাজুল ইসলামের বয়স মাত্র ২৫ বছর। তিনি নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ধুলিরাম বানিয়াপাড়া এলাকার নাড্ডা মিয়ার ছেলে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ২০১৭ সালে কাজের সন্ধানে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আসেন। পরে সাদমা ফ্যাশনে আয়রন ম্যান হিসেবে চাকরি নেন। সামান্য আয় দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে সংসার চলছিল। কিন্তু একের পর এক অসুস্থতা তার সেই স্বপ্নকে আজ কঠিন সংকটে ফেলেছে।
এজাজুল ও তার স্ত্রীর তিন সন্তান—ফাহিম (৮), হোসাইন (৪) ও হযরত আলী (৮ মাস)। বড় ছেলে ফাহিমকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন ছিল বাবার। কিন্তু অভাবের কারণে তার পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয় সন্তান হোসাইন জন্মের পর থেকেই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
এরপর জন্ম নেয় হযরত আলী। বয়স এখন মাত্র ৮ মাস। জন্মের প্রায় দেড় মাস পর ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে হার্ট ফাউন্ডেশন এবং হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির হৃদ্যন্ত্রে দুটি ছিদ্র রয়েছে।
শিশুটির বাবা জানান, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার কারণে হযরত আলী প্রায়ই অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ে। তখন কোলে নিয়ে, বুকে জড়িয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন বাবা-মা। কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে নিজের শরীরও ভালো নেই এজাজুলের। তিনি কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। নিজের চিকিৎসার সামর্থ্যও নেই। কিন্তু তিনি কাজে না গেলে পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলবে না। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিন কর্মস্থলে ছুটতে হয় তাকে।
বর্তমানে এজাজুল স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়নের রাখালিয়াচালা এলাকায় কালামের বাসায় ভাড়া থাকেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সামান্য আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া ও সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে। এর সঙ্গে দুই সন্তানের চিকিৎসা ও নিজের চিকিৎসার খরচ যোগ হওয়ায় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এজাজুল ইসলাম বলেন, “আমি আমার বাচ্চার কান্না সহ্য করতে পারছি না। আমার চোখের সামনে সন্তান কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?”
তিনি বলেন, “এক সন্তান জন্ম থেকেই হাঁটতে পারে না, ছোট সন্তানটির হার্টে দুটি ছিদ্র। আমিও কিডনির সমস্যায় ভুগছি। কিন্তু নিজের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। অসুস্থ শরীর নিয়েও আমাকে কাজ করতে হচ্ছে। কাজ না করলে স্ত্রী-সন্তান না খেয়ে থাকবে। আমি কী করব, কোথায় যাব—কিছুই বুঝতে পারছি না।”
সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়ে এজাজুল বলেন, “আমার সন্তানদের চিকিৎসার জন্য যদি কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে হয়তো আমার সন্তানদের জীবনটা বাঁচানো সম্ভব হবে। যারা আমার পাশে দাঁড়াবেন, আমি তাদের জন্য সারা জীবন দোয়া করে যাব।”
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, “পরিবারে যদি কোনো প্রতিবন্ধী সদস্য থাকেন এবং তিনি সরকারি ভাতার জন্য যোগ্য হন, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পরিবারটির অন্য কোনো ধরনের আর্থিক বা চিকিৎসাসংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে তারা উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এককালীন আর্থিক সহায়তা কিংবা চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এজাজুলের গল্প শুধু একজন অসহায় বাবার গল্প নয়; এটি এমন একটি পরিবারের গল্প, যেখানে একের পর এক অসুস্থতা তাদের স্বপ্নগুলোকে থামিয়ে দিয়েছে। এক সন্তান জন্ম থেকেই হাঁটতে পারে না, আরেক সন্তানের হৃদ্যন্ত্রে দুটি ছিদ্র, বাবা নিজেও কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। অর্থের অভাবে চিকিৎসা ও পড়াশোনা—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তারপরও হাল ছাড়েননি এজাজুল। সন্তানের মুখে হাসি দেখার আশায় নিজের কষ্ট ভুলে প্রতিদিন কাজে ছুটছেন। কিন্তু একার পক্ষে আর কতটা সম্ভব?
হয়তো সমাজের কোনো বিত্তবান মানুষের সামান্য সহযোগিতাই হযরত আলীর চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে। সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো আবারও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবেন এজাজুল।