লেখক: মোঃ আশিক মোস্তফা (মাইক্রোবায়োলজিস্ট) ঢাকার একটি ব্যস্ত সরকারি হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে গভীর রাত। হঠাৎ দেখা গেল সদ্য জন্মানো এক নবজাতককে দ্রুত NICU-তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শিশুটি শ্বাস নিতে পারছিল না। প্রথমে চিকিৎসকেরা সাধারণ সেপসিস ভেবেছিলেন, কিন্তু দুই দিনের মধ্যে রিপোর্ট জানাল অন্যরকম বাস্তবতা—শিশুটি আক্রান্ত এমন একটি ব্যাকটেরিয়ায়, যার বিরুদ্ধে হাসপাতালের প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। […]
লেখক: মোঃ আশিক মোস্তফা (মাইক্রোবায়োলজিস্ট)
ঢাকার একটি ব্যস্ত সরকারি হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে গভীর রাত। হঠাৎ দেখা গেল সদ্য জন্মানো এক নবজাতককে দ্রুত NICU-তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শিশুটি শ্বাস নিতে পারছিল না। প্রথমে চিকিৎসকেরা সাধারণ সেপসিস ভেবেছিলেন, কিন্তু দুই দিনের মধ্যে রিপোর্ট জানাল অন্যরকম বাস্তবতা—শিশুটি আক্রান্ত এমন একটি ব্যাকটেরিয়ায়, যার বিরুদ্ধে হাসপাতালের প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।
এই জীবাণুটি হলো CRE—এখন বাংলাদেশের নতুন ‘সাইলেন্ট কিলার’।
ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; গত দু’ বছরে এমন ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন বাড়ছে? কেন নবজাতক ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত? এবং এর ভয়াবহতা কতটা?
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতা ও অতিরিক্ত ব্যবহার এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের হাসপাতালে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে কার্বাপেনেম-রেজিস্ট্যান্ট এনটেরোব্যাকটেরিয়েসি (CRE)। এর সবচেয়ে বড় শিকার—নবজাতক ও গর্ভবতী মা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশে হাসপাতাল–অর্জিত সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সংক্রমণের ধরনে পরিবর্তন এসেছে; সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া না দেওয়া ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (NICU), লেবার ওয়ার্ড এবং পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিটগুলো এখন উচ্চ-ঝুঁকির জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।গর্ভবতী মায়েরা দ্বিগুণ ঝুঁকিতে
গর্ভধারণের সময় নারীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। ফলে সংক্রমণ দ্রুত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীদের অ্যান্টিবায়োটিক এমনভাবে দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) বেশ সাধারণ। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এখন অনেক UTI রোগী প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া দিচ্ছেন না। ফলে চিকিৎসা দীর্ঘ হয়, জটিলতা বাড়ে, এমনকি প্রি-টার্ম ডেলিভারির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
হাসপাতাল পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার
দেশের অনেক হাসপাতালেই সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়—এমন অভিযোগ নতুন নয়। হ্যান্ড হাইজিন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্তকরণের ক্ষেত্রে ঘাটতির কারণে ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘদিন টিকে থাকে। বিশেষ করে NICU ও লেবার ওয়ার্ডে শিশুরা অত্যন্ত সংবেদনশীল; সামান্য অবহেলাও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।১০ বছর আগেও নবজাতক সেপসিসের চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ ছিল।
কিন্তু এখন?
বাংলাদেশের প্রায় সব বড় NICU–তেই একটি নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়—
ESBL, MDR, CRE।
এগুলো শুধু ‘বৈজ্ঞানিক নাম’ নয়; এগুলো এমন ব্যাকটেরিয়া, যাদের থামানোর জন্য কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় নেই।
প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ এর বিভাগীয় প্রধান ডঃ দয়ানিধি সরকার বলেন—
“এখনকার নবজাতকরা জন্মের পরই এমন ব্যাকটেরিয়ার টার্গেটে পড়ে, যেগুলো ১০-১২ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ হয় না।”
ফল:
গর্ভবতী মায়েরা দ্বিগুণ ঝুঁকিতে
গর্ভধারণের সময় নারীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। ফলে সংক্রমণ দ্রুত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীদের অ্যান্টিবায়োটিক এমনভাবে দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।
মিরপুর শিশু হাসপাতাল এর NICU নার্স মিস জুয়েনা বলেন—
“আমরা নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু জনবল কম, ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেশি। সব সময় শতভাগ ইনফেকশন কন্ট্রোল মেনে চলা সম্ভব হয় না।”
এই সুযোগেই জীবাণুগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন রোগীকে সংক্রমিত করে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনায় নীতিগত দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু হাসপাতালে নয়; অ্যান্টিবায়োটিকের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়েই বড় প্রশ্ন আছে।
১. প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি
ফার্মেসিতে সহজে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। অনেকেই নিজে নিজে ওষুধ শুরু করেন, আবার ঠিকমতো কোর্স শেষ করেন না।
২. অপর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা
দেশের বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালে উন্নত AST (Antimicrobial Susceptibility Testing) ব্যবস্থা নেই। ফলে কোন ব্যাকটেরিয়া কোন ওষুধে প্রতিরোধী—তা জানা কঠিন।
৩. অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপের অভাব
বেশিরভাগ হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর নজরদারি নেই।
CRE–এর দ্রুত বৃদ্ধি: কেন উদ্বেগ এত বেশি?
CRE হলো এমন একটি ব্যাকটেরিয়া গ্রুপ যা সাধারণত শেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কার্বাপেনেম অ্যান্টিবায়োটিককেও নিস্ক্রিয় করে দেয়। বাংলাদেশে এর হার দ্রুত বাড়ছে।
কারণগুলো হল—
অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষার অভাব
বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতাল, ল্যাব, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য বিভাগে মাইক্রোবায়োলজিস্টরা নীরবে যে যুদ্ধটি লড়ছেন, তা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করছে।
AMR নজরদারি (Surveillance)
মাইক্রোবায়োলজিস্টরা প্রতিদিন—
কোন ব্যাকটেরিয়া বাড়ছে
কোন অ্যান্টিবায়োটিকে রেজিস্ট্যান্স
কোথায় CRE ছড়াচ্ছে
এসব ট্র্যাক করে দেশের স্বাস্থ্য নীতির ভিত্তি তৈরি করেন।
ল্যাব-ভিত্তিক সঠিক চিকিৎসা নির্দেশনা
AST (Antibiotic Susceptibility Test) ছাড়া চিকিৎসা অন্ধকারে তীর ছোঁড়া।
মাইক্রোবায়োলজিস্টরাই চিকিৎসকদের সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক গাইডলাইন দেন।
NICU, ICU ও হাসপাতালের IPC তৈরি ও মনিটরিং
মাইক্রোবায়োলজিস্ট ছাড়া IPC প্রোগ্রাম সফল হওয়ার প্রশ্নই নেই।
প্রি-নাটাল ও পোস্ট-নাটাল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ
গর্ভবতী মায়েদের উচ্চ ঝুঁকির ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা ও চিকিৎসা নির্দেশনা দেওয়া হয় মাইক্রোবায়োলজিস্টদের মাধ্যমে।
নীতিনির্ধারণী পরামর্শ
অ্যান্টিবায়োটিক নীতিমালা (AMR policy, stewardship guideline) তৈরির মূলে থাকেন মাইক্রোবায়োলজিস্টরাই।
জনস্বাস্থ্য সচেতনতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক রিপোর্টিং
পত্রপত্রিকা, মিডিয়া ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার কাজও করেন মাইক্রোবায়োলজিস্টরা—যদিও অনেক সময় তাদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়।
কীভাবে আমরা এই সংকট থেকে বের হতে পারি?
অ্যান্টিবায়োটিক নিষেধাজ্ঞা কঠোর করা
প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ
OTC অ্যান্টিবায়োটিক বাজার বন্ধ
প্রতিটি জেলা হাসপাতালে মাইক্রোবায়োলজিস্ট বাধ্যতামূলক নিয়োগ
জাতীয় AMR Surveillance নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা
NICU, ICU-তে কঠোর IPC অনুসরণ
পশুপালন খাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ
দেশব্যাপী Antibiotic Stewardship Program চালু করা
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা মাইক্রোবায়োলজিস্টের হাতে
নবজাতকদের রক্ষা করতে হলে, গর্ভবতী মায়েদের জীবন বাঁচাতে হলে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে—
মাইক্রোবায়োলজিস্টদের গুরুত্ব বুঝতে হবে
তাদের গবেষণা, অবকাঠামো ও নীতিগত ক্ষমতায়ন করতে হবে
কারণ AMR যেভাবে বাড়ছে, আজ যদি আমরা না দাঁড়াই—
আগামী প্রজন্ম অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন পৃথিবীতে জন্মাবে।