[location_search]
সম্পূর্ণ নিউজ ভোরের বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক
৫:১১ অপরাহ্ণ, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক: কূটনীতির নতুন সমীকরণ

মোঃ আবদুল মান্নান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সব সময়ই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ে হান ঝ্যাং এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বৈঠক সেই ভারসাম্যের রাজনীতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ—এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যতা নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু এই […]

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক: কূটনীতির নতুন সমীকরণ
৩ মিনিটে পড়ুন |

মোঃ আবদুল মান্নান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সব সময়ই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ে হান ঝ্যাং এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বৈঠক সেই ভারসাম্যের রাজনীতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ—এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যতা নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু এই বাস্তবতা কাদের জন্য কী বার্তা বহন করে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চীনের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই বাস্তববাদী। Chinese Communist Party শুধু সরকার-টু-সরকার সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগ বজায় রাখে। এই কৌশল তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কৌশলের পুনরাবৃত্তি নতুন কিছু নয়, কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ দেশে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্ক, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন—সব মিলিয়ে একটি অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় চীনের এই বার্তা স্পষ্ট: তারা কোনো একটি রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে চায় না। বাংলাদেশের সরকার দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনোই একমুখী নয়। চীন যখন একই সঙ্গে বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহ দেখায়, তখন তা সরকারের জন্য একটি নীরব সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সব সময় বিকল্প পথ খোলা রাখে। প্রশ্ন হলো—সরকার কি এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করছে? বিএনপির জন্য এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ। ‘এক চীন’ নীতিতে অটল থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা একটি বার্তা দিয়েছে—তারা আন্তর্জাতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটি শুধু চীনের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও একটি সংকেত—বিএনপি নিজেদেরকে একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে এখানেও একটি প্রশ্ন রয়ে যায়—এই কূটনৈতিক সক্রিয়তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হবে? চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নির্বাচনকে “শান্তিপূর্ণ ও সফল” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এটি সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু একই সময়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করে। একদিকে সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থনের দাবি করতে পারে, অন্যদিকে সেই একই শক্তি বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী—এই দ্বন্দ্ব সরকারের একক বৈধতার ধারণাকে দুর্বল করে। চীনের কূটনীতিতে ‘পার্টি-টু-পার্টি’ সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্যও প্রস্তুতি নেয়। বাংলাদেশে এই মডেল কার্যকর হলে, তা একটি ইতিবাচক দিকও নির্দেশ করে—রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়বে, অভিজ্ঞতা বিনিময় হবে, এবং নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন একটি সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ—যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তারা কি কূটনীতিকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রেখেছে? তারা কি বিরোধী দলকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে? যদি তা হয়ে থাকে, তবে এই কৌশল এখন আর কার্যকর নয়। কারণ, আধুনিক বিশ্বে কূটনীতি বহুমাত্রিক। এখানে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, অর্থনীতি এবং জনগণের অংশগ্রহণ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। চীন এবং বাংলাদেশ-এর সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে দৃঢ়। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে এই সম্পর্ক ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতি এই সম্পর্ককে নতুন একটি দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে—যেখানে: রাজনৈতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো হবে, দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে। সব বিতর্ক, সমালোচনা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল সরকারের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও কৌশলগত সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন: অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। সরকার, বিরোধী দল এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার—সবাই যদি এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি একটি সংকট নয়, বরং একটি সুযোগে পরিণত হতে পারে। সেই সুযোগের নাম—সহযোগিতা, ভারসাম্য এবং পারস্পরিক সম্মান। আর তাই বলা যায়, সব মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ঊর্ধ্বে উঠে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও উন্নত হোক—এটাই সময়ের দাবি, এটাই ভবিষ্যতের পথ। লেখক ঃ গবেষক, কলামিষ্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক।

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেন্ডার
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
আরও ভোরের বাংলাদেশ সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

সর্বশেষ