[location_search]
সম্পূর্ণ নিউজ ভোরের বাংলাদেশ

প্রচ্ছদ
৮:৩১ অপরাহ্ণ, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

পাথর শ্রমিকদের ভাগ্য বদলায়নি চার দশকেও

আন্তর্জাতিক মে দিবসে যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে, তখন সিলেটের জাফলং ও বিছানাকান্দির বাস্তবতা এক কঠিন সত্য উন্মোচন করে-উন্নয়ন ঘটছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শ্রমিকরা রয়েছেন প্রান্তে।   দীর্ঘ চার দশক ধরে পাথর উত্তোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি একসময় এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস ছিল। স্থানীয় […]

পাথর শ্রমিকদের ভাগ্য বদলায়নি চার দশকেও
মনসুর আলম, গোয়াইনঘাট ( সিলেট) :
৪ মিনিটে পড়ুন |

আন্তর্জাতিক মে দিবসে যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে, তখন সিলেটের জাফলং ও বিছানাকান্দির বাস্তবতা এক কঠিন সত্য উন্মোচন করে-উন্নয়ন ঘটছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শ্রমিকরা রয়েছেন প্রান্তে।

 

দীর্ঘ চার দশক ধরে পাথর উত্তোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি একসময় এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস ছিল। স্থানীয় সূত্র মতে, প্রায় দুই লক্ষাধিক পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নদী ও পাহাড়ঘেঁষা এই অঞ্চলে হাজার হাজার শ্রমিক পাথর সংগ্রহ, ভাঙা ও পরিবহনের কাজে নিয়োজিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প কাঠামো গড়ে তোলে।

 

শতবর্ষী পাথর শ্রমিক লিলু মিয়ার পরিবার এই ইতিহাসের প্রতীক। দাদা থেকে বাবা, বাবা থেকে ছেলে-প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পেশায় আবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা এখন ভেঙে পড়েছে অনিশ্চয়তার চাপে।

 

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে শুরু হওয়া এই শিল্প ধীরে ধীরে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের বিপরীতে গড়ে ওঠে বিপুল সম্পদ, যার বড় অংশ চলে যায় সুবিধাভোগীদের হাতে। শুরুতে নৌকা প্রতি সামান্য চাঁদা থেকে যে প্রক্রিয়ার সূচনা, তা আজও ভিন্ন রূপে বহমান-শুধু প্রেক্ষাপট বদলেছে, কাঠামো নয়।

 

গত এক দশকে পরিবেশগত ঝুঁকি ও আইনগত বিধিনিষেধের কারণে পাথর উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। প্রায় ১৪.৯৩ কিলোমিটার এলাকা পরিবেশগত সংকটাপন্ন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণার পর কার্যত বন্ধ হয়ে যায় শ্রমিকদের প্রধান আয়ের উৎস। কোনো সুস্পষ্ট পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারকে ঠেলে দেয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার গভীরে।

 

অন্যদিকে, একই সময়ে জাফলং-বিছানাকান্দি পর্যটন খাতে দ্রুত উত্থান ঘটে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অঞ্চল এখন লাখো পর্যটকের গন্তব্য। কোটি কোটি টাকার লেনদেনের এই নতুন অর্থনীতি দৃশ্যত সমৃদ্ধ হলেও, এর সুফল থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে শ্রমিক শ্রেণি।

 

জাফলংয়ের শ্রমিক আব্দুল আজিজের কথায়,“পাথর ছিল আমাদের জীবন। এখন সেটাও নাই, নতুন কিছু শেখার সুযোগও নাই।”

 

বিছানাকান্দির রহিম মিয়ার কণ্ঠেও একই হতাশা“পর্যটন বাড়ছে, কিন্তু আমরা ওইখানে কাজ পাই না।”

 

মূলত দক্ষতার অভাব, প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকা এবং পরিকল্পিত পুনর্বাসনের অভাবে শ্রমিকরা নতুন অর্থনীতিতে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারছেন না। ফলে অর্থনীতির পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন তারাই।

 

নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা, বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি

 

অনুসন্ধানে উঠে আসে, পাথর খাতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট শ্রমিকদের ব্যবহার করে বিপুল সম্পদ আহরণ করেছে। বর্তমানেও পর্যটন খাতে বিনিয়োগের বড় অংশ একই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ খাত বদলেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের কাঠামো অপরিবর্তিত।

 

প্রজন্মগত দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-এই সংকট এখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে। শ্রমিক পরিবারের শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে এক অব্যাহত দারিদ্র্যের চক্র।

 

দারিদ্র্য -শ্রম -শিক্ষা বঞ্চনা -পুনরায় দারিদ্র্য।

 

স্থানীয় শিক্ষক রুহুল আমিন জানান, ইতোমধ্যে শতশত শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে এবং আরও অনেক শিশু একই ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

জীবনযাপনের বহুমাত্রিক সংকট বর্তমানে এ অঞ্চলের শ্রমিকরা একযোগে তিনটি বড় চাপের মুখে-আয়ের প্রধান উৎস হারানো, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব, এবং নতুন খাতে দক্ষতার ঘাটতি।

 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের বোঝা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক অভিযানের প্রভাব। ফলে অনেক পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

 

শ্রমিক ইমান আলী বলেন, “আগে কষ্ট ছিল, কিন্তু কাজ ছিল। এখন কাজই নাই।”

 

লাল মিয়ার ভাষায়, “এখন কষ্টই বেশি, আয় কম।”

 

শ্রমিক আব্দুল জলিলের প্রশ্নই যেন পুরো বাস্তবতার সারসংক্ষেপ-“যাদের ঘামে এই অঞ্চল গড়ে উঠেছে, তাদের বাদ দিয়ে কি উন্নয়ন সম্ভব?”

 

বিশ্লেষকদের মতে, জাফলং-বিছানাকান্দির অর্থনীতি পাথর থেকে পর্যটনে রূপান্তরিত হলেও, এই পরিবর্তন অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। শ্রমিকদের বাইরে রেখে গড়ে ওঠা এই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শ্রমিকদের জিবিকায় চরমভাবে বিপদগ্রস্ত?

 

স্থানীয় শ্রমিক নেতা নাঈম পারভেজ বলেন, “অর্থনীতির চাকা ঘোরে শ্রমিকের ঘামে। উন্নয়নে তাদের অংশীদার করতে না পারলে এই অগ্রগতি প্রশ্ন রাখে?

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা জানান, জাফলং-বিছানাকান্দির শ্রমিকদের বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয়, অর্থনৈতিক রূপান্তর তখনই অর্থবহ, যখন তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। এখন প্রয়োজন নীতিগত সিদ্ধান্ত-দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শ্রমিকদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। অন্যথায়, উন্নয়নের এই গল্প ইতিহাসে লেখা থাকবে-কিছু মানুষের প্রাপ্তি আর অধিকাংশের বঞ্চনার কাহিনি হিসেবে।

 

এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।”

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেন্ডার
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
আরও ভোরের বাংলাদেশ সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

সর্বশেষ