রাস্তার পাশে দুই ফালি টিনে ঘেরা ছোট্ট একটি ঘর। নেই কোনো দরজা, জানালা কিংবা বিদ্যুতের ব্যবস্থা। দিনের আলোও ঠিকমতো প্রবেশ করে না সেখানে। সেই অন্ধকার ঘরেই বছরের পর বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভূঞারপাড়া এলাকার অসহায় বৃদ্ধা মোছা. আনোয়ারা বেগম (৭০)। স্বামী মৃত আকবর আলীর মৃত্যুর প্রায় ৩৮ বছর […]
রাস্তার পাশে দুই ফালি টিনে ঘেরা ছোট্ট একটি ঘর। নেই কোনো দরজা, জানালা কিংবা বিদ্যুতের ব্যবস্থা। দিনের আলোও ঠিকমতো প্রবেশ করে না সেখানে। সেই অন্ধকার ঘরেই বছরের পর বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভূঞারপাড়া এলাকার অসহায় বৃদ্ধা মোছা. আনোয়ারা বেগম (৭০)।
স্বামী মৃত আকবর আলীর মৃত্যুর প্রায় ৩৮ বছর পর থেকে চরম অভাব-অনটন, অসুস্থতা ও একাকীত্বের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আনোয়ারা বেগমের হাঁটাচলার শক্তিও প্রায় হারিয়ে গেছে। তার দাবি, হাত-পা ভাঙা ও শারীরিক নানা জটিলতার কারণে লাঠিতে ভর দিয়েও ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। খুব কষ্ট করে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতে পারেন। ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করার মতো শারীরিক সক্ষমতাও নেই। ফলে কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন, না দিলে অনেক সময় অনাহারেই দিন কাটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারা বেগমের বিয়ে হয়েছিল উপজেলার মাদারজানী এলাকায়। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন পার করেছেন তিনি। কষ্ট করে দুই মেয়ের বিয়ে দিলেও একমাত্র ছেলে বর্তমানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে টাঙ্গাইলে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করেন। স্বামীর নামে থাকা এক শতাংশ জমিও বিক্রি হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ারা বেগম রাস্তার পাশে ছেঁড়া দুটি পলিথিন টানিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতেন। একটি পলিথিন ছিল মাথার ওপর ছাউনি হিসেবে, অন্যটি মাটিতে বিছিয়ে রাত কাটাতেন। পরে তার দুরবস্থা দেখে এলাকার কয়েকজন যুবক উদ্যোগ নিয়ে ছোট্ট একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে দেন। তবে সেই ঘরেও নেই দরজা, জানালা কিংবা বিদ্যুতের ব্যবস্থা। ফলে দিন-রাত অন্ধকারেই বসবাস করতে হয় তাকে।
বর্তমানে তার ঘরে নেই টয়লেট, টিউবওয়েল বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে ঘরের সামনের খোলা জায়গাতেই প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে হয়। শারীরিক দুর্বলতার কারণে দূরে নির্জন স্থানে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই তার। রাতে অন্ধকারে ঘরের বাইরে যেতে ভয় পান বলে জানান তিনি। এছাড়া চিকিৎসার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছেন। রাতে আলো না থাকায় এবং মশার উপদ্রবে তার দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
আনোয়ারা বেগম বলেন, “অনেক দিন না খেয়ে কাটিয়েছি। এমন ঈদও গেছে, যেদিন সেমাই বা মাংস খেতে পারিনি। আমি অসুস্থ, চিকিৎসার প্রয়োজন। আমার কোনো টয়লেট ও টিউবওয়েল নেই। রাতে একা থাকতে ভয় লাগে। আল্লাহ ছাড়া আমাকে দেখার কেউ নেই।”
তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “আমার সমস্যাগুলো বিবেচনা করে চিকিৎসা, নিরাপদ বসবাস এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিলে জীবনের বাকি সময়টা একটু শান্তিতে কাটাতে পারব।”

স্থানীয়রা আরও জানান, আনোয়ারা বেগমের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকায় তিনি বয়স্ক ভাতা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কোনো সুবিধা পাননি। ফলে সরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত রয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে গোপালপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. এখলাস উদ্দিন বলেন, “এনআইডি কার্ড ছাড়া তাকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন হলে তাকে সরকারি ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে এবং মানবিক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও এলাকাবাসী অসহায় এই বৃদ্ধার জন্য দ্রুত জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, একটি স্যানিটারি টয়লেট, সুপেয় পানির উৎস এবং নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
“গোপালপুর পৌরসভার ভূঞারপাড়া এলাকায় রাস্তার পাশে টিনের ছোট্ট ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন অসহায় বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম। “